Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 12:56 pm

যমুনার জলে স্বপ্ন, ঋণের জালে জীবন গুঠাইল ঘাটের জেলেদের

image

জামালপুর প্রতিনিধি: ভোরের আলো ফোটার আগেই যমুনার বুক চিরে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন জেলেরা। রাতভর জাল ফেলে ধরা মাছ নিয়ে ফিরেন জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গুঠাইল পাইলিং ঘাটে। সেখানে শুরু হয় মাছের বেচাকেনার ব্যস্ততা। কিন্তু যমুনার জলে মাছ থাকলেও জেলেদের জীবনে যেন স্বস্তি নেই। নদীর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে কমে মাছ, কমে আয়। আর সংসার চালাতে, নৌকা মেরামত কিংবা জাল কিনতে গিয়ে অনেকের জীবন জড়িয়ে পড়ে ঋণের জালে।

সবে ফুটেছে ভোরের আলো। চারপাশে তখনও কুয়াশার আবেশ কাটেনি। এরই মধ্যে যমুনার বুকে শুরু হয়ে যায় জেলেদের জীবনযুদ্ধ। একে একে ঘাটে ভিড়তে থাকে নৌকা। নৌকা থেকে নামানো হয় রাতভর কষ্ট করে ধরা মাছ। কারও ঝুড়ি ভরা মাছ, আবার কারও ধরা মাছ এতটাই কম যে তা বিক্রি করে সংসারের বাজার খরচ মেটানোই কঠিন।

প্রতিদিন ভোরে যমুনার মাছ নিয়ে গুঠাইল ঘাটে জড়ো হন শত শত জেলে, পাইকার ও খুচরা ক্রেতা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে পুরো ঘাট। তবে এই কোলাহলের আড়ালেই চাপা পড়ে থাকে জেলেদের দীর্ঘশ্বাস আর অনিশ্চয়তার গল্প।

যমুনায় পানি বাড়লে মাছের সরবরাহও বাড়ে। তখন জেলেদের মুখে ফুটে ওঠে আশার আলো। কিন্তু পানি কমতে শুরু করলেই কমে যায় মাছ। সঙ্গে কমতে থাকে আয়ও। তখন সংসার চালানো, নৌকা মেরামত কিংবা ছিঁড়ে যাওয়া জাল কিনতে অনেককেই ছুটতে হয় আড়ৎদারদের কাছে।

গুঠাইল ঘাটের আড়ৎদার রিপন মিয়া জানান, বছরের শুরুতে জেলেরা জাল ও নৌকা মেরামতের জন্য কিছু টাকা অগ্রিম নেন। পরে মাছ বিক্রির টাকা থেকে অল্প অল্প করে সেই ঋণ পরিশোধ করেন। ধরা মাছ ন্যায্য দামে বিক্রি করে ঋণের টাকা রেখে বাকি অর্থ জেলেদের দেওয়া হয়।

আরেক আড়ৎদার রবিউল জানান, যমুনা নদীর বিভিন্ন প্রজাতির মাছের কদর দেশজুড়ে রয়েছে। তাই প্রতিদিন জেলার বাইরের বিভিন্ন স্থান থেকেও পাইকাররা গুঠাইল ঘাটে মাছ কিনতে আসেন।

এই ঘাটে এখনো অনেকটাই পুরোনো নিয়মে চলে মাছের বেচাকেনা। আড়ৎদারের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় মাছের দাম। ফলে নিজেদের ধরা মাছের মূল্য নির্ধারণে জেলেদের হাতে অনেক সময় খুব বেশি সুযোগ থাকে না।

গুঠাইল ঘাটের জেলে শ্রী নরেশ চন্দ্র জানান, নদীতে এখন আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। যতটুকু পাওয়া যায়, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়েই অনেক জেলে এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

সাপধরী এলাকার জেলে রবিজল জানান, বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি থাকায় কিছু মাছ পাওয়া যায়। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমে গেলে জেলেদের অলস সময় পার করতে হয়। তখন সংসার চালানোর জন্য মহাজনদের কাছ থেকে দাদন বা ঋণ নিতে হয়। পরে মাছ বিক্রি করে সেই ঋণ শোধ করতে হয়। এভাবেই অভাব-অনটনের মধ্যে চলছে তাদের জীবন।

দিন শেষে মাছ বিক্রি করে যখন ঘাট ছাড়েন জেলেরা, তখনও তাদের চোখে থাকে নতুন দিনের আশার আলো। কারণ যমুনাই তাদের জীবিকা, যমুনাই তাদের স্বপ্ন, আবার এই নদীই তাদের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।

যমুনার ঢেউয়ের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে যারা মানুষের পাতে মাছ তুলে দেন, তাদের নিজেদের পাতে প্রতিদিন খাবার জোটে কি না, সেই হিসাব হয়তো কেউ রাখে না। মাছের সঙ্গে তারা নদী থেকে তুলে আনেন বেঁচে থাকার স্বপ্নও। কিন্তু মাছের অভাব, সংসারের টানাপোড়েন আর ঋণের বোঝায় সেই স্বপ্ন যেন বারবার ডুবে যায় যমুনার গভীর জলে।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি