Print Date & Time : 28 October 2026 Wednesday 04:27 am

এবার মহাকাশযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন

image

তথ্য-প্রযুক্তি ডেস্ক: সম্ভাব্য মহাকাশযুদ্ধের জন্য নিজেদের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। পৃথিবীর কক্ষপথে শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইট অনুসরণ, নজরদারি, জ্যাম করা, অচল করে দেওয়া কিংবা প্রয়োজনে ধ্বংস করতে সক্ষম প্রযুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে তৈরি হচ্ছে ‘হান্টার স্যাটেলাইট’—যেগুলো অন্য মহাকাশযানের কাছাকাছি গিয়ে সেটিকে পর্যবেক্ষণ বা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মতো কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুনে চীনের একটি গোপনীয় মানববিহীন স্পেসপ্লেন পৃথিবী থেকে কয়েকশ মাইল ওপরে একটি ছোট স্যাটেলাইট কক্ষপথে ছাড়ে। এরপর ওই স্যাটেলাইটটি আরেকটি চীনা স্যাটেলাইটের চারপাশে ঘোরাফেরা করে এবং পরে স্পেসপ্লেনটির দিকে ফিরে আসে। এই ধরনের কক্ষপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন করছে।

চীনা স্যাটেলাইটগুলো ইতোমধ্যে এমন কৌশল প্রদর্শন করেছে, যাকে মার্কিন কর্মকর্তারা মহাকাশের ‘ডগফাইটিং’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। একাধিক স্যাটেলাইটকে সমন্বিতভাবে কাছাকাছি অবস্থানে পরিচালনা এবং একটি অকেজো স্যাটেলাইটকে ধরে অন্য কক্ষপথে সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও চীনের রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু চীন নয়, যুক্তরাষ্ট্রও মহাকাশে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সম্প্রতি একটি সন্দেহভাজন চীনা গোয়েন্দা স্যাটেলাইটের কাছাকাছি যৌথ মহাকাশ অভিযান পরিচালনা করেছে। এর মাধ্যমে মিত্রদের মধ্যে সমন্বয় এবং সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধের সক্ষমতা প্রদর্শনের বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

মহাকাশে সম্ভাব্য সংঘাতের অস্ত্র শুধু স্যাটেলাইটে সীমাবদ্ধ নয়। পশ্চিমা কর্মকর্তারা স্থলভিত্তিক লেজার, ইলেকট্রনিক জ্যামার, সাইবার হামলা এবং অ্যান্টি-স্যাটেলাইট ক্ষেপণাস্তরকেও বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটকে লক্ষ্য করে লেজার বা অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনাও নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

আধুনিক যুদ্ধে স্যাটেলাইটের গুরুত্ব ব্যাপক। যোগাযোগ, নেভিগেশন, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ এবং সামরিক বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণে স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে কোনো বড় সংঘাত শুরু হলে প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইট ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সও চীনের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। মার্কিন তথ্য অনুযায়ী, চীনের সামরিক বাহিনীর ৫১০টির বেশি গোয়েন্দা, নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহে সক্ষম স্যাটেলাইট রয়েছে। একই সঙ্গে চীন ২০২৬ সালে মহাকাশে উৎক্ষেপণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে।

তবে মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়াও কক্ষপথে সামরিক সক্ষমতা এবং স্যাটেলাইটবিরোধী প্রযুক্তি উন্নয়নে সক্রিয়। ফলে পৃথিবীর কক্ষপথ ক্রমেই এমন একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে, যেখানে সামরিক ও বেসামরিক স্যাটেলাইট পাশাপাশি অবস্থান করছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মহাকাশে কোনো সংঘাত শুরু হলে একটি স্যাটেলাইট ধ্বংসের ঘটনাও বিপুল পরিমাণ মহাকাশ-আবর্জনা তৈরি করতে পারে। এতে শুধু সামরিক নয়, যোগাযোগ, আবহাওয়া, নেভিগেশন ও বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বর্তমান প্রতিযোগিতা কেবল ‘মহাকাশে কে এগিয়ে’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ভবিষ্যতের যুদ্ধে কক্ষপথ নিয়ন্ত্রণ, শত্রুর স্যাটেলাইট নিষ্ক্রিয় করা এবং নিজেদের মহাকাশ সম্পদ সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা এখন জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

—জা. অর্থনীতি/এএইচএ