ইবি প্রতিনিধি: বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর ‘হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন’ (হিট) প্রকল্পের আওতায় সাভারের ব্র্যাক সিডিএমে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী জাতীয় উপাচার্য সংলাপে অংশ নিয়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) উপাচার্য। সংলাপ শেষে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও কৌশলগত রূপান্তরে ২০২৬–২০৩০ মেয়াদের জন্য প্রস্তাবিত “Transforming Higher Education in Bangladesh: A National Agenda for Sustainable Excellence” শীর্ষক জাতীয় মহাপরিকল্পনার বিস্তারিত সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমান জানান, দেশের উচ্চশিক্ষাকে টেকসই, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং শতভাগ কর্মসংস্থানমুখী করার লক্ষ্যে বিদ্যমান কর্মপরিকল্পনা (২০১৮–২০৩০) পরিমার্জন করে ৫টি প্রধান স্ট্র্যাটেজিক পিলারের ওপর ভিত্তি করে এই নতুন জাতীয় এজেন্ডা তৈরি করা হয়েছে। ইউজিসির ‘হিট’ (HEAT) প্রজেক্টের সাথে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা ও গবেষণার সার্বিক আধুনিকায়নে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ১৫ দফা কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
উপাচার্য কর্তৃক উপস্থাপিত জাতীয় মহাপরিকল্পনার মূল দিকগুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে ইবি প্রশাসনের গৃহীত উদ্যোগগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
ক্যাম্পাস ডিসিপ্লিন, নিরাপত্তা ও পরিবেশ
উদ্যোগ: নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সিসি ক্যামেরা স্থাপন, পর্যাপ্ত লাইটিং এবং 'গ্রিন ও ক্লিন ক্যাম্পাস' গঠন।
উপাচার্য জানান, বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণের পাশাপাশি ক্যাম্পাসের পকেট গেটগুলো বন্ধের চেষ্টা চলছে। তবে কেবল বাউন্ডারি ওয়াল দিয়ে নিরাপত্তা সম্ভব নয়, যদি না অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আনা হয়। পুরো ক্যাম্পাসকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা, নির্জন এলাকায় লাইটিং, আইডি কার্ড বাধ্যতামূলক করা, বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং অতিরিক্ত আনসার সদস্য নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পুকুর দুর্ঘটনা রোধ ও বিকল্প ব্যবস্থা
উদ্যোগ: কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও নতুন সুইমিং জোন তৈরি।
উপাচার্য জানান, সাইনবোর্ড ও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দুর্ঘটনাপ্রবণ পুকুরে নামলে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিকল্প হিসেবে প্রকৌশল অফিসের পেছনের পুকুরটিকে পরিষ্কার করে সাঁতারের উপযোগী করার পাশাপাশি চারপাশে হাঁটার পথ ও বসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সহ-শিক্ষা ও ক্রীড়া উন্নয়ন
উদ্যোগ: ডিবেটিং সোসাইটি পুনর্গঠন ও স্টেডিয়াম নির্মাণ।
উপাচার্য জানান, বিতর্ক, সংস্কৃতি ও খেলাধুলায় গুরুত্ব বাড়াতে ইবি ডিবেটিং সোসাইটিকে শক্তিশালী করার জন্য কমিটি গঠিত হয়েছে এবং যুব ফোরাম (ঢাকা)-এর সাথে যৌথভাবে তরুণদের চিন্তাভাবনা বিকাশের নানা কর্মসূচি আয়োজন করা হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলেছে।
ডিজিটালাইজেশন, ইউনিক ID ও ওয়েবসাইট আধুনিকায়ন
উদ্যোগ: 'এডু আইডি' প্রদান, একক ডিজিটাল সিস্টেম ও রিসার্চ প্রোফাইল আপলোড।
উপাচার্য জানান, প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য ইউনিক ডিজিটাল আইডি 'এডু আইডি' বরাদ্দ করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে ভর্তি থেকে সনদ পর্যন্ত সব তথ্য ও সেবা এক জায়গায় মিলবে। পরীক্ষার ফলাফলের জটিলতা কাটাতে KUET-এর বিশেষজ্ঞ টিমের ফিজিবিলিটি স্টাডির ভিত্তিতে ম্যানুয়াল পদ্ধতি বাদ দিয়ে পুরো ব্যবস্থা একক ডিজিটাল সিস্টেমে আনা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক র্যাংকিং ও কোলাবোরেশনের জন্য শিক্ষকদের ওয়েবসাইটে নিজ নিজ রিসার্চ প্রোফাইল আপলোডের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একাডেমিক সংস্কার, আধুনিক কারিকুলাম ও প্রযুক্তি
উদ্যোগ: ইন্টার-ডিসিপ্লিনারি কোর্স, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট ও আধুনিক প্রযুক্তি যুক্তকরণ।
উপাচার্য জানান, ইসলামী ও আধুনিক শিক্ষার অনন্য সমন্বয় ঘটাতে কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থীরা ইসলামিক স্টাডিজ এবং আল-কুরআন/আল-হাদিসের শিক্ষার্থীরা সোশ্যাল সায়েন্স বা বিজনেস স্টাডিজের ক্রেডিট কোর্স পড়তে পারবে। ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে চালুর চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় থাকা 'ইনস্টিটিউট অব আধুনিক ভাষা'-য় চাইনিজ, জাপানিজ ও আরবি শেখানো হবে। একইসাথে যুগের চাহিদায় কারিকুলাম পুনঃডিজাইন করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), ডাটা সায়েন্স, রোবোটিক্স, সাইবার সিকিউরিটি ও প্রাকটিক্যাল স্কিলস অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
গবেষণা, ইনোভেশন সেন্টার ও HEAT প্রজেক্টের গভর্ন্যান্স
উদ্যোগ: 'ইনোভেশন সেন্টার' প্রতিষ্ঠা ও গবেষণার মান নিয়ন্ত্রণ।
উপাচার্য জানান, শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, স্টার্টআপ উদ্যোগ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি (Intellectual Property) বিকাশে 'ইসলামিক ইউনিভার্সিটি রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার' প্রতিষ্ঠার প্রজেক্ট প্রপোজাল তৈরি করে দ্রুত সরকারের কাছে পেশ করা হবে। এছাড়া শুধুমাত্র পেপার জমা দিয়ে অর্থ নেওয়ার প্রথা বন্ধ করে মানসম্মত গবেষণা সুনির্দিষ্ট জার্নালে প্রকাশ নিশ্চিতে ৫ সদস্যের একটি সাব-কমিটি কাজ করছে, যা শীঘ্রই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ইউজিসিতে জমা দেবে।
আন্তর্জাতিকীকরণ ও অ্যালামনাই সমন্বয়
উদ্যোগ: 'ইন্টারন্যাশনাল সেল' গঠন ও সেন্ট্রাল অ্যালামনাই প্ল্যাটফর্ম।
উপাচার্য জানান, বৈশ্বিক সংযোগ, স্কলারশিপ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় সহজ করতে একটি কার্যকর ‘ইন্টারন্যাশনাল সেল’ গঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত করতে সব বিভাজন দূর করে একটি ঐক্যবদ্ধ "ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই" সেন্ট্রাল প্ল্যাটফর্ম গড়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
শিক্ষক উন্নয়ন ও শিক্ষণ পদ্ধতি
উদ্যোগ: তরুণ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও 'সুপারনিউমারারি' শিক্ষক নিয়োগ।
উপাচার্য জানান, শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে লেকচারার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর লেভেলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অভিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের 'সুপারনিউমারারি' হিসেবে অ্যাপয়েন্ট করে সমন্বিত 'ইকো-লার্নিং সিস্টেম' গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া মেলবন্ধন ও শতভাগ ইন্টার্নশিপ
উদ্যোগ: কর্মমুখী শিক্ষা, সার্বজনীন ইন্টার্নশিপ ও উদ্যোক্তা তৈরি।
উপাচার্য জানান, সনদনির্ভর শিক্ষার বদলে শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী যোগ্য প্রার্থী গড়তে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবরেশন চালু করা হচ্ছে। বিজনেস, সায়েন্স, সোশ্যাল সায়েন্স বা থিওলজিসহ প্রতিটি অনুষদ নিজস্ব বিষয় অনুযায়ী সব শিক্ষার্থীর জন্য ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করবে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু সনদনির্ভর চাকরির পেছনে না ছুটে ডিজিটাল উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত হবে।
শিক্ষার্থী সহায়তা ও মানসিক স্বাস্থ্য
উদ্যোগ: এনডাউমেন্ট ফান্ড গঠন ও নিয়মিত কাউন্সিলিং।
উপাচার্য জানান, অর্থাভাবের কারণে যেন কোনো শিক্ষার্থীর পড়ালেখা ব্যাহত না হয়, সে জন্য ‘স্টুডেন্ট সাপোর্ট অ্যান্ড হায়ার এডুকেশন এনডাউমেন্ট ফান্ড’ চালু করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও বিষাদ দূর করতে নিয়মিত কাউন্সিলিং সেবার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
ছাত্রী আবাসন সংকট নিরসন ও সম্পদের সঠিক ব্যবহার
উদ্যোগ: অব্যবহৃত শিক্ষক ভবনকে ছাত্রী হলে রূপান্তর।
উপাচার্য জানান, আধুনিক নাগরিক সুবিধার অভাবে শিক্ষকরা ক্যাম্পাসের আবাসন ভবনে না থাকায় ভবনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত ও অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। সমাধান হিসেবে এসব ভবনকে ছাত্রী হলে রূপান্তর করা এবং শিক্ষকদের জন্য অর্ধেক খরচে কুষ্টিয়া বা ঝিনাইদহে বিকল্প মানসম্মত আবাসনের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি