Print Date & Time : 16 October 2026 Friday 06:48 am

নেপালের প্রলয়ংকরী আকস্মিক বন্যা: বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে, কতটা প্রস্তুত

image

ড. এ টি এম শাখাওয়াত হোসেন ও ইখতিয়ার মাহমুদ: গত ২৬ আগস্ট বুধবার সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমালয়ের গভীরে একটি হিমবাহের বড় অংশ ভেঙে পড়ে। প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উঁচু থেকে বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল অংশ ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকায় আছড়ে পড়ে যার শক্তি ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য যা প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্প বলেই মনে করা হয়েছিল। এ ধসের ফলে লহেন্দে খোলা নদীতে সাময়িকভাবে একটি প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয় যা কিছুক্ষণ পরই ভেঙে বিপুল জলরাশি ভোটে কোশি ও ত্রিশূলী নদী হয়ে নিচের দিকে ধেয়ে আসে। মুহূর্তের মধ্যে ত্রিশূলী নদীর পানি প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়, ভেসে যায় ঘরবাড়ি, সেতু ও সড়ক। নেপাল কর্তৃপক্ষের হিসাবে মৃতের সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে গেছে, নিখোঁজ প্রায় দেড় হাজার মানুষ, যাদের একটি বড় অংশ বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী।

এ দুর্যোগ একটি জরুরি প্রশ্ন সামনে এনেছে, বাংলাদেশেও কি এমন আকস্মিক বন্যা হতে পারে? উত্তরটি একরৈখিক নয়। নেপালের মতো হিমালয়ের উঁচুতে হিমবাহ-ধসজনিত বন্যা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঘটার সুযোগ নেই, কারণ দেশের নিজস্ব কোনো হিমবাহ নেই। কিন্তু এর মানে এই নয় যে বাংলাদেশ আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিমুক্ত। বরং আকস্মিক বন্যা বাংলাদেশে একটি ইতোমধ্যে-বিদ্যমান, বারবার ফিরে আসা বাস্তবতা।

বাংলাদেশে আকস্মিক বন্যা 
বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) দেশের বন্যাকে যে কয়েকটি ধরনের ভাগ করে তার একটি হলো আকস্মিক বা পাহাড়ি ঢলজনিত বন্যা। এর মূল কারণ, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয় ও ত্রিপুরার পাহাড়ি এলাকায় স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত যার পানি দ্রুত নেমে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও ময়মনসিংহের হাওড়াঞ্চলে ঢুকে পড়ে। অর্থাৎ বৃষ্টি বাংলাদেশের ভেতরে না হলেও বন্যা বাংলাদেশে চলে আসতে পারে— এটাই এই অঞ্চলের সবচেয়ে বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য।

এ বছরের বর্ষা মৌসুমেও এই ঝুঁকি বারবার সামনে এসেছে। জুন ও জুলাই মাসে একাধিকবার এফএফডব্লিউসি সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও শেরপুরে আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে, কারণ সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার পানি দ্রুত বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। জুলাইয়ে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে এক দিনে ৪০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয় যা চলতি বছরের দেশের সর্বোচ্চ। আগস্টেও কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে একাধিক জেলায় প্রাণহানি ও ব্যাপক জনদুর্ভোগ দেখা গেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, আকস্মিক বন্যা বাংলাদেশে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নয় বরং প্রতি মৌসুমের বাস্তবতা।

 উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওড় এলাকা (সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ) এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় বর্ষা পূর্ববর্তী সময়ে এ বন্যা প্রায়ই আঘাত হানে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ উজানে অবস্থিত নেপাল ও ভারতের নদী অববাহিকার নিম্নপ্রবাহে অবস্থান করায় আন্তঃসীমান্ত বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। নেপাল বা ভারতের উজান অঞ্চলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি বা আকস্মিক বন্যা হলে সেই পানি দ্রুত বাংলাদেশে প্রবেশ করে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করতে পারে। একইভাবে, বাংলাদেশে ২৪ ঘণ্টায় অতিভারী বৃষ্টিপাত হলেও স্থানীয়ভাবে ফ্ল্যাশ ফ্লাডের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এছাড়াও বাংলাদেশে ফ্লাশ ফ্লাড নতুন নয়। ২০২২ সালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৫৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ এলাকা তলিয়ে যায়, যেখানে বিশুদ্ধ পানীয়জলের তীব্র সংকট ও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

২০১৭ সালে এপ্রিলের শুরুতেই হওয়া এমনই এক অকাল আকস্মিক বন্যা হাওড় অঞ্চলের বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছিল। অস্বাভাবিক আগাম ও তীব্র বৃষ্টিতে প্রায় নির্বিঘ্নে পাকা হতে যাওয়া বোরো ধান তলিয়ে যায়। প্রায় ১ হাজার ৮৪৫টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, বন্যার পর প্রায় ৬২ শতাংশ পরিবার খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় পড়েছিল, বিশেষত মৎস্যজীবী ও দিনমজুর পরিবারগুলো। এছাড়া ২০২২ সালের উত্তর-পূর্বাঞ্চল আবারও ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় অঞ্চলটির প্রায় ৫৬ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয় এবং প্রায় ১ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়; কৃষিজমির একটি বড় অংশও পানির নিচে চলে যায়। বিশুদ্ধ পানীয়জলের তীব্র সংকটন ও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এই দুই ঘটনা মিলিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে  প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয় বাংলাদেশে আকস্মিক বন্যা হবে কি না বরং পরবর্তী আকস্মিক বন্যা কতটা দ্রুত ও তীব্র হবে এবং তার আগে আমরা কতটা প্রস্তুত থাকব।

নেপালের বিপদ কি বাংলাদেশ পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে?
দক্ষিণ এশিয়ার নদীব্যবস্থা রাজনৈতিক সীমানা মানে না। নেপালের লহেন্দে খোলা নদী থেকে নেমে আসা পানি ভোটে কোশি ও ত্রিশূলী নদী হয়ে অবশেষে নারায়ণী-গান্ডক নদীতে মিশে ভারতের বিহার রাজ্যে প্রবেশ করে। ঘটনার পরপরই ভারতের কেন্দ্রীয় জল কমিশন (সিডব্লিউসি) গান্ডক নদীর নিম্নাঞ্চলে পানি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার সতর্কতা জারি করে এবং বিহার সরকার বাল্মীকিনগরে গান্ডক ব্যারাজের সবগুলো গেট খুলে দেয়। এই অতিরিক্ত পানি হাজিপুর-সোনপুর হয়ে গঙ্গায় মিশে ফারাক্কা ব্যারাজ পার হয়ে বাংলাদেশের গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় প্রবেশ করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ তার এক পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন। তবে স্বস্তির বিষয় হলো পাহাড়ি ঢল যতই নিচের দিকে নামে, ততই তার শক্তি কমতে থাকে— তাই নেপালের এই ঢল একই তীব্রতায় বাংলাদেশে আছড়ে পড়বে এমন আশঙ্কা বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত নয়। কিন্তু এই ঘটনাই আরেকবার মনে করিয়ে দেয়, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার আন্তঃসীমান্ত সংযোগ কতটা গভীর এবং আঞ্চলিক তথ্য বিনিময় কতটা জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনের ছায়া
নেপালের এই নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করার মতো তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি— বিজ্ঞানীরা এখনও ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করছেন। তবে বৃহত্তর হিমালয় অঞ্চলের প্রবণতা স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক পার্বত্য উন্নয়ন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে ২০০০ সালের পর হিমবাহের বরফক্ষয়ের হার দ্বিগুণ হয়েছে এবং গত কয়েক দশকে ছোট হিমবাহগুলো তুলনামূলক দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। হিমবাহ গলনের সঙ্গে সঙ্গে পার্বত্য ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে এবং হিমবাহী হ্রদ ফেটে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। নেপাল, ভারত ও তিব্বত মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৩ হাজারের বেশি হিমবাহী হ্রদ চিহ্নিত হয়েছে যার মধ্যে অন্তত ৪৭টি বিপজ্জনক বলে গণ্য করা হয়েছে। এই হিমালয়েরই একদম ভাটির দিকে একেবারে ব-দ্বীপের প্রান্তে বাংলাদেশের অবস্থান।

আকস্মিক বন্যা বিপৎসীমার পুনর্নির্ধারণ ও পুনর্মূল্যায়ন
সাধারণ বর্ষাকালীন বন্যা এবং আকস্মিক বন্যার চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। গবেষণায় দেখা গেছে, আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রে নদীর পানি অনেক কম উচ্চতাতেই ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সুনামগঞ্জে প্রচলিত বন্যার বিপৎসীমা ৮ দশমিক ২৫ মিটার হলেও ফ্ল্যাশ ফ্লাডের জন্য এই বিপৎসীমা ৬ দশমিক ৪১ মিটারে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেছেন গবেষকরা। এর চেয়ে বেশি উচ্চতায় গেলেই হাওড়ের বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়।

বাংলাদেশ কী করতে পারে: আটটি করণীয়
১. উজানের তথ্য দ্রুত হাতে পাওয়া। আকস্মিক বন্যা মোকাবিলার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সময়। মেঘালয় বা ত্রিপুরার পাহাড়ে বৃষ্টি শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সে তথ্য বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো দরকার। এজন্য শুধু নদীর পানির উচ্চতা নয়, উজানের প্রকৃত বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, কোন অববাহিকায় হচ্ছে এবং আগামী তিন থেকে ছয় ঘণ্টায় আরও কতটা হতে পারে। এই বাস্তব-সময়ের তথ্য বিনিময়ের একটি শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।

২. প্রচলিত বন্যা ও আকস্মিক বন্যার জন্য আলাদা বিপৎসীমা। জার্নাল অব হাইড্রোলজিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রকাশিত এক গবেষণায় উত্তর-পূর্ব হাওড় অঞ্চলের ৪০টি স্থানে পৃথক আকস্মিক বন্যা বিপৎসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে যা বহু ক্ষেত্রে প্রচলিত মৌসুমি বন্যার বিপৎসীমার চেয়ে অনেক নিচে। যেমন- সুনামগঞ্জে প্রচলিত বিপৎসীমা যেখানে প্রায় ৮ দশমিক ২৫ মিটার সেখানে আকস্মিক বন্যা বিপৎসীমা প্রস্তাব করা হয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৪১ মিটার। একই মাত্রার পানি একেক ধরনের বন্যায় একেক রকম বিপদ ডেকে আনতে পারে— তাই আলাদা প্রান্তঃসীমা (থ্রেশহোল্ড), পৃথক পূর্বাভাস মডেল এবং পৃথক জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা প্রয়োজন।

৩. সতর্কবার্তা নয়, দ্রুত পদক্ষেপ। শুধু মোবাইলে বার্তা পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। সতর্কবার্তা পাওয়ার পর উদ্ধার নৌকা মোতায়েন, গবাদিপশু সরানো, ফসল কেটে ফেলা ও আশ্রয়কেন্দ্র সক্রিয় করার মতো ধাপগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুরু হওয়ার মতো কাঠামো থাকা দরকার। প্রতিটি ইউনিয়নে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী দল—যাদের কাছে থাকবে নৌকা, লাইফ জ্যাকেট ও যোগাযোগ যন্ত্র গড়ে তোলা জরুরি, কারণ আকস্মিক বন্যার সময় সরকারি দল পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় মানুষই প্রথম সাড়াদানকারী হয়ে ওঠেন।

৪. প্রযুক্তিনির্ভর পূর্বাভাস আরও এগিয়ে নেওয়া। সাম্প্রতিক গবেষণায় হাওড় অঞ্চলের জন্য মেশিন লার্নিংভিত্তিক একটি ৭২ ঘণ্টার আকস্মিক বন্যা পূর্বাভাস মডেল তৈরি হয়েছে যা স্যাটেলাইট রাডার তথ্য ও উজানের নদী-প্রবাহ অনুমান ব্যবহার করে প্রায় ৯১ শতাংশ নির্ভুলতায় আকস্মিক বন্যা শনাক্ত করতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। কারণ হাওড় অঞ্চলে জলস্তর পরিমাপক স্টেশনের সংখ্যা এখনও অপ্রতুল—২০১৭ সালের বন্যার সময় নিকটবর্তী কয়েকটি স্টেশনই অকার্যকর ছিল। এ ধরনের গবেষণাভিত্তিক মডেলকে জাতীয় পূর্বাভাস ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

৫. বোরো ধানকে আকস্মিক বন্যা সহনশীল করা। হাওড়ের অর্থনীতি মূলত একটি ফসলের ওপর নির্ভরশীল বলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি সরাসরি খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। স্বল্পমেয়াদি জাতের ধান আবাদ, আগাম চারা রোপণ এবং উঁচু জমিতে raised-bed পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরির মতো ব্যবস্থা কৃষি বিজ্ঞানীরা সুপারিশ করেছেন যাতে ফসল কাটার আগেই আকস্মিক বন্যা ধেয়ে এলেও ক্ষতি কম হয়।

৬. বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ। হাওড়ের ফসল-রক্ষা বাঁধ শুধু নির্মাণ করলেই হয় না- নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নদী-খাল খননের মাধ্যমে প্রবাহ সচল রাখাও জরুরি। তবে খনন কোনো সর্বজনীন সমাধান নয়— কোথায় পলি অপসারণ প্রয়োজন, কোথায় প্রাকৃতিক জলাভূমি সংরক্ষণ জরুরি তা নির্ধারণে জলাধারভিত্তিক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।

৭. হাওড়কে প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে সংরক্ষণ। হাওড় বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বন্যা-ধারণ ব্যবস্থার অংশ। অপরিকল্পিত সড়ক, দখল বা নিষ্কাশন-বাধার কারণে এই ধারণক্ষমতা কমে গেলে আকস্মিক বন্যার পানি দ্রুত বসতি ও ফসলি জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। তাই অবকাঠামো নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত কালভার্ট ও ক্রস-ড্রেনেজ নিশ্চিত করে জলপ্রবাহের স্বাভাবিক সংযোগ অক্ষুণ্ণ রাখা জরুরি।

৮. স্যাটেলাইট তথ্য ও স্থানীয় জ্ঞানের সমন্বয়। এফএফডব্লিউসি ইতোমধ্যে ওপেন-অ্যাক্সেস স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করে ২০১৭ ও ২০২২ সালের বন্যার প্লাবন-মানচিত্র তৈরি করেছে যা উদ্ধার ও ত্রাণ পরিচালনায় সহায়ক হয়েছিল। এর পাশাপাশি নদীর পানির রং, স্রোতের পরিবর্তন বা পশু-পাখির আচরণ দেখে বন্যার আগাম আভাস পাওয়ার মতো বহু পুরোনো স্থানীয় অভিজ্ঞতাও এখনও মূল্যবান। বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস এই ঐতিহ্যগত পর্যবেক্ষণের বিকল্প নয়, বরং সম্পূরক— দুইয়ের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিউনিটিভিত্তিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

নেপালের ঘটনাকে শুধু দূরের এক করুণ দুর্যোগের খবর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি সতর্কসংকেত যে হিমালয় দ্রুত বদলাচ্ছে আর তার নিচেই বাংলাদেশের অবস্থান। বাংলাদেশে হয়তো হিমবাহ ভেঙে বন্যা নামবে না কিন্তু আমাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রতি বছরই কোনো না কোনোরূপে আকস্মিক বন্যা আঘাত হানছে। কখনও এপ্রিলের আগাম বৃষ্টিতে, কখনও ভারতের পাহাড়ি catchment-এর প্রবল বর্ষণে। ২০১৭ ও ২০২২ সালের অভিজ্ঞতা এবং এই বছরের বারবার সতর্কবার্তা আমাদের যথেষ্ট শিক্ষা দিয়েছে। বন্যাকে পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয় কিন্তু তা কখন আসতে পারে তা আগেভাগে জানা, মানুষকে সময়মতো সরিয়ে নেওয়া, ফসল আগেই কেটে ফেলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো আগেভাগে সুরক্ষিত করার মাধ্যমে দুর্যোগকে বিপর্যয়ে পরিণত হওয়া থেকে অনেকাংশে ঠেকানো সম্ভব। তাই আজকের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয় বাংলাদেশে আকস্মিক বন্যা হবে কি না। প্রশ্ন হওয়া উচিত পরবর্তী আকস্মিক বন্যা যখন আসবে তখন আমরা কি এবার সত্যিই প্রস্তুত থাকব?


ড. এ টি এম শাখাওয়াত হোসেন: অধ্যাপক, ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 
ইখতিয়ার মাহমুদ: গবেষক (এশিয়ান জেওইজি, SEAHDS)