মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: আমরা তাদের এক নামেই চিনি ‘চা শ্রমিক’। কিন্তু এই একটি পেশাগত পরিচয়ের আড়ালে চাপা পড়ে আছে ৩০ থেকে ৩৫টি ক্ষুদ্র আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। দীর্ঘদিনের তীব্র দারিদ্র্য, বঞ্চনা আর চরম বৈষম্যের চক্রে পিষ্ট হয়ে তাদের সেই স্বতন্ত্র পরিচয় আজ বিলুপ্তির পথে।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও হবিগঞ্জের চানপুরসহ বিভিন্ন চা-বাগানে ঘুরে দেখা যায় এই নির্মম বাস্তবতার চিত্র। হবিগঞ্জের চানপুর চা-বাগানের শ্রমিক গৌরা বাউরি আক্ষেপ করে বলেন, "অভাব-অনটনের কারণে আমরা নিজেদের জাতিসত্তাই ভুলে গেছি। কোনো বিশেষ দিবস আমাদের জীবনে ভিন্ন কিছু নিয়ে আসে না, সব দিনই এক।"
শ্রীমঙ্গলের হরিণছড়া চা-বাগানের শ্রমিক কৈশলা ঘাটোয়াল জানান, ১৪ বছর বয়স থেকে কাজ করছেন তিনি। শুরুতে মজুরি ছিল ২০ টাকা, আর এতদিন পর তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৮৭ টাকায়। তিনি বলেন, "দুই বেলা ঠিকমতো খেতেই পারি না। নিজের একটা ভালো ঘরের স্বপ্ন দেখি, কিন্তু এই আয়ে তা কীভাবে সম্ভব? জমিও তো আমাদের নিজস্ব নয়।"
প্রচণ্ড রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কচি পাতা তোলা এবং সপ্তাহজুড়ে কঠোর শ্রমের পরও তাদের মেলেনি নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন বা উন্নত স্বাস্থ্যসেবা। পাশাপাশি মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ না থাকায় হারিয়ে যাচ্ছে সাঁওতালি, কুরুখ, মুন্ডারি প্রভৃতি ভাষা, যার জায়গা দখল করছে 'সাদরি' ভাষা।
সিলেট চা জনগোষ্ঠী ছাত্র যুব কল্যাণ পরিষদের সভাপতি দিলীপ কুর্মী অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, "চা শ্রমিক কোনো জাতিগত পরিচয় নয়। চা গাছকে যেমন নির্দিষ্ট উচ্চতার বেশি বাড়তে দেওয়া হয় না, তেমনি চা-শ্রমিকদের জীবনও এক সীমানায় আটকে রাখা হয়েছে। আমরা ওপর থেকে শুধু বাগানের সবুজটাই দেখি, কিন্তু ভেতরের কান্না দেখি না।"
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল ও অন্যান্য স্থানীয় অধিকারকর্মীরা জানান, প্রজন্মের পর প্রজন্ম শ্রম দিলেও জমি কিংবা সুযোগ-সুবিধার অধিকার পাননি এই শ্রমিকের দল। অনেক পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী সরকারি অনুদানের খবর পর্যন্ত জানতে পারে না।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দেশের চা শিল্পকে টিকিয়ে রাখা এই প্রাণশক্তিগুলোর জাতিগত পরিচয়, মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি