জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: ২০২৪ সালের ১ আগস্ট যখন ছাত্র আন্দোলন তুঙ্গে, ঠিক তখনই জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করে এক বিশাল চাল চেলেছিল শেখ হাসিনা সরকার। ভেবেছিল—এটাই হবে আন্দোলনের কফিনে শেষ পেরেক!
২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নামে দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে এসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষ, ছাত্রলীগের হামলা আর প্রাণহানির ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আন্দোলন পরিণত হয় সরকার পতনের ‘এক দফা’ দাবিতে।
এমনই এক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ২৬ জুলাই বিএনপি ডান, বাম ও ইসলামী দলগুলোকে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানায়। ৩০ জুলাই জামায়াতও এই ঐক্যে সাড়া দেয়।
এদিকে সরকার আন্দোলনকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাত থেকে সরিয়ে 'রাজনৈতিক তকমা' দেওয়ার কৌশল খোঁজে। তারা ভেবেছিল, আন্দোলনটি শিক্ষার্থীদের নয়- বরং এর পেছনে আছে জামায়াত-শিবির।
আরও পড়ুন: ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশের মানুষের সম্মিলিত অবদানের ফল’
সে বছর ২৯ জুলাই গণভবনে ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়।
বৈঠকের পর ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমকে জানান, দেশজুড়ে সহিংসতা ও নাশকতার অভিযোগে তাদের নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। অবশেষে ১ আগস্ট সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
আসল হিসাবটা কোথায় ভুল ছিল?
সরকার ও গোয়েন্দারা ভেবেছিল- নিষিদ্ধ হওয়ার পর জামায়াত-শিবির ক্ষোভে রাজপথে আলাদা দলীয় কর্মসূচি নিয়ে নামবে, জ্বালাও-পোড়াও করবে। সেই সুযোগে পুরো আন্দোলনকে ‘জঙ্গি বা সন্ত্রাসী হামলা’ বলে আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়াভাবে শক্ত হাতে দমন করা যাবে।
কিন্তু সরকারের এই চাল ধরে ফেলে জামায়াত। দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, তারা সচেতনভাবেই কোনো দলীয় কর্মসূচির ফাঁদে পা দেননি। এমনকি কোনো আলাদা প্রতিবাদ মিছিলও করেননি। বরং জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা দলীয় ব্যানার ও পরিচয় গোপন রেখে সাধারণ ছাত্র-জনতার কাতারে মিশে যান। তারা সরকারের পাতা রাজনৈতিক ফ্রেমে না ঢুকে, আন্দোলনকে সম্পূর্ণ 'জনগণ বনাম ফ্যাসিবাদের' লড়াই হিসেবেই একমুখী রাখতে কাজ করেন।
আরও পড়ুন: জুলাইযোদ্ধা আজিজুরের রক্ত ঝরানোর গল্প শুনলেন প্রধানমন্ত্রী
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের এই সিদ্ধান্তটি ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের একটি বিশাল ‘মিসক্যালকুলেশন’ বা ভুল হিসাব। এটি ছিল সম্পূর্ণ একটি অর্গানিক অভ্যুত্থান। কিন্তু সরকার এটিকে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেছিল। রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে দমানো গেলেও রাস্তায় নেমে আসা জাগ্রত সাধারণ জনতাকে গুলি করে থামানো যায় না।
অবশেষে আন্দোলন ভিন্ন খাতে নেওয়ার এই শেষ বাজিতেও আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হয়। আর তার ঠিক চার দিন পর ৫ আগস্ট ঘটে যায় সেই ঐতিহাসিক পতন!