অনলাইন ডেস্ক: রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৩৫ জনের প্রাণহানির ঘটনার এক বছর পূর্ণ হচ্ছে মঙ্গলবার (২১ জুলাই)। বিভীষিকাময় ওই দিনের ভয়ংকর স্মৃতি এখনো তাড়া করে ফেরে বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারকে। আকাশে বিমানের শব্দ বা আগুন দেখলেও আঁতকে উঠছে তারা।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই, দিনটি ছিল সোমবার। দুপুর সোয়া ১টা নাগাদ স্কুলের হায়দার আলী ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই মডেলের যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তেই এক মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারণা হয় সেখানে।
দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে পুড়ে যায় ছোট শিশুদের কোমল শরীর। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকসহ অন্তত ৩৫ জন নিহত হয়। আহত হয় শতাধিক। হতাহতদের অধিকাংশই শিশু। নিহতদের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিন জন শিক্ষক, তিন জন অভিভাবক ও বিমানের পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামও।

আহত ১৭৫ জনের মধ্যে শিক্ষার্থী ৬৩ জন। আহতরা দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে ক্লাসে ফিরলেও অধিকাংশই এখনো স্বাভাবিকে ফিরে আসতে পারেনি। ছোট কোমলমতি শিক্ষার্থী যারা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন, আজও তাদের বুকের ভিতর শূন্যতা আর হাহাকার। হূদয়ে রক্তক্ষরণ থামলেও দগদগে বিষাদের সেই ক্ষণ, আকাশ থেকে নেমে আসা আগুনের লেলিহান শিখা, আর্তনাদ, বন্ধুদের হারানোর শোকসহ চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বিভীষিকাময় সেই দুঃসহ স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়াচ্ছে অনেক শিক্ষার্থীকে।
অভিভাবকরা বলেন, আহত শিক্ষার্থীরা সবকিছুতেই এখন বিরক্ত দেখায়, হঠাত্ রেগে যায়। আকাশে বিমানের আওয়াজ শুনলে এখনো অনেকে আতঙ্কে শিউরে ওঠে ও কান চেপে ধরে। বেশির ভাগই ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছে না, আবার কেউ মাঝ রাতে ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠছে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর শিশুদের মনে গভীর মানসিক আঘাত বা ট্রমা তৈরি হয়েছে, যা তারা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কেবল শারীরিক চিকিৎসাই যথেষ্ট নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিং সেবা শিশুদের স্বাভাবিক শৈশবে ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির পর বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা পেলেও হতাহতের পরিবার সরকারের পক্ষ থেকে কোন আর্থিক সহায়তা পায়নি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ লাখ ও আহতদের ৫ লাখ করে টাকা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এটা খুবই সীমিত সহায়তা হিসেবে আখ্যায়িত করে অভিভাবকরা তা প্রত্যাখ্যান করেন।
আহত ৬ষ্ঠ শ্রেণির (ইংরেজি ভার্শন) শিক্ষার্থী জাইয়ানা মাহবুবের মা সানজিদা বেলায়েত বলেন, অভিভাবকদের পক্ষ থেকে গত ১৭ জুন প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত্ চেয়ে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখনো সাক্ষাত্ পাইনি।
প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের জন্য লিখিত আবেদনে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে শহীদ ও আহতদের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলো হলো—শহীদ পরিবারের সুরক্ষায় ও আহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনে পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং দ্রুত হাইকোর্টের রিটের বাস্তবায়ন। আহতদের জন্য আজীবন বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা ও সিএমএইচ থেকে বিশেষ মেডিক্যাল কার্ডের ব্যবস্থা করা। নিহতদের রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদি মর্যাদা ও সনদ প্রদান করা। ২১ জুলাইকে ‘জাতীয় শিক্ষা শোক দিবস’ ঘোষণা এবং শহীদদের স্মরণে উত্তরায় একটি মসজিদ নির্মাণ করতে হবে।
—জা. অর্থনীতি/এএইচএ