Print Date & Time : 28 October 2026 Wednesday 07:57 am

ফুটবলবিশ্ব কাঁপানো স্পেনের বুকে যেভাবে ইসলামের আগমন ঘটে

image

ইসলাম ডেস্ক: বিশ্বকাপ ফুটবলের সোনালী ট্রফিটা যখন স্প্যানিশদের হাতে, তখন মাদ্রিদ থেকে বার্সেলোনা বুঁদ হয়ে আছে জয়ের উল্লাসে। ঠিক এই মুহূর্তে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের পরাশক্তি স্পেনের মাটি ও ইতিহাসের এক অন্যরকম রোমাঞ্চকর সংযোগের কথা মনে করিয়ে দেয় ক্যালেন্ডারের পাতা। আজ যে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন স্প্যানিশ ফুটবলাররা, ঠিক ১৩ শতাব্দী আগে সেই আইবেরিয়ান উপদ্বীপের মাটির ভাগ্য বদলে দিয়েছিলেন এক অকুতোভয় মুসলিম সেনাপতি। তিনি তারেক বিন জিয়াদ। যার রণকৌশলে স্পেনের বুকে রোপিত হয়েছিল ইসলাম। ফুটবলজয়ী স্পেনের আড়ালে থাকা সেই মহানায়কের ট্রাজিক গল্প আমাদের অনেকের অজানা।

খ্রিস্টীয় ৬৭০ অব্দে আলজেরিয়ায় জন্ম নেওয়া তারেক বিন জিয়াদ ছিলেন উত্তর আফ্রিকার স্বাধীনচেতা আমাজিঘ বা বার্বার বংশোদ্ভূত। গভর্নর মুসা বিন নুসাইরের হাত ধরে দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি হয়ে ওঠেন উমাইয়া বাহিনীর প্রধান বিশ্বস্ত সেনাপতি। মরক্কোর তাঞ্জিয়ারের গভর্নর থাকার সময় থেকেই তারেক স্বপ্ন দেখতেন ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপে ইসলামের বার্তা পৌঁছানোর। মরক্কোর মাটিতে তাঁর নির্মিত প্রথম ঐতিহাসিক শারাফাত মসজিদ আজও সেই স্বপ্নের নীরব সাক্ষী।

৭১১ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে মাত্র ৭ হাজার সৈন্য নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেন তারেক। স্পেনের মাটিতে পা রেখেই তিনি তাঁর রণতরীগুলো পুড়িয়ে ফেলার এক ঐতিহাসিক ও সাহসী নির্দেশ দেন। সৈন্যদের উদ্দেশ্যে তাঁর অমোঘ বাণী ছিল, ‘পেছনে সমুদ্র, সামনে শত্রু; এখন যুদ্ধ ছাড়া কোনো পথ নেই।’ পিছু হটার পথ বন্ধ করে মাত্র ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে ওয়াদি লাক্কার ঐতিহাসিক যুদ্ধে রাজা রডারিকের ১ লাখ অশ্বারোহী বাহিনীকে ধূলিসাৎ করে দেন এই বীর। যে পাহাড়ে তিনি প্রথম অবতরণ করেছিলেন, তাঁর নামানুসারেই সেটি আজ বিশ্বজুড়ে 'জিব্রাল্টার' (জাবাল আল-তারিক) নামে পরিচিত।

ওয়াদি লাক্কার বিজয়ের পর কর্ডোবা এবং তৎকালীন রাজধানী টলেডো জয় করেন তারেক। উদ্ধার করেন হযরত সুলাইমান (আ.)-এর আমলের ঐতিহাসিক স্বর্ণের টেবিল। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের এই মহানায়ক শেষ পর্যন্ত রাজনীতির দাবার ঘুঁটিতে হেরে যান। বিপুল ধনসম্পদ নিয়ে উমাইয়া রাজধানী দামেস্কে পৌঁছালে তৎকালীন খলিফা সুলাইমান বিন আবদুল মালিক ক্ষমতার সমীকরণে এই বীরকে চরমভাবে অবমূল্যায়ন করেন। ফলে, এক পরম বিস্মৃতির অন্ধকারে তলিয়ে যান আন্দালুসিয়ার এই ত্রাতা।

৭২০ খ্রিস্টাব্দের দিকে দামেস্কের এক অজানা রাস্তায় চরম দরিদ্র ও নিঃস্ব ভবঘুরে হিসেবে এই বীর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বলে ধারণা করা হয়। আজ তাঁর কোনো সমাধি না থাকলেও স্পেনের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ব্রিটিশ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল জিব্রাল্টার তাদের ব্যাংক নোটে তরবারি হাতে তারেক বিন জিয়াদের ছবি ও নাম উৎকীর্ণ করে তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আজকের বিশ্বকাপজয়ী স্পেনের মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে এই আমাজিঘ মুসলিম বীরের বীরত্বগাথা, যিনি বিজয়ী হয়েও ইতিহাসের পাতায় এক ট্রাজিক হিরো হিসেবে চিরকাল অমর হয়ে রইলেন।

জা. অর্থনীতি/ উমার