রহমত রহমান, ঢাকা: আর্থিক সংকটে থাকা একীভূত পাঁচটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বকেয়া করের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। গ্রাহকদের কাছ থেকে নিয়মিত উৎসে কর কেটে রাখা হলেও সেই অর্থের বড় অংশ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। কর আদায়ে এনবিআর বিভিন্ন শাখা ব্যবস্থাপকের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নিলে নতুন জটিলতা তৈরি হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে দুই পক্ষের বৈঠকে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের বিষয়ে ঐকমত্য হয়। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী জাতীয় অর্থনীতির হাতে এসেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়। সভায় পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসক, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা, এনবিআর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা অংশ নেন। আর্থিক সংকটে পড়া এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে ব্যাংক রেজল্যুশন স্কিম-২০২৫ এর আওতায় একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠন করা হয়েছে।
কর বকেয়া ও অনিয়ম
এনবিআরের হিসাবে, পাঁচ ব্যাংকের কাছে সরকারের বকেয়া করের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। কর্মকর্তারা বলেন, আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী এই কর আদায় করা তাদের আইনগত দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দিলে ভবিষ্যতে রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে। সভায় কয়েকটি গুরুতর অনিয়মও তুলে ধরা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কর পরিশোধের জন্য সংরক্ষিত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আবার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসেবে বিনিয়োগ করা হয়েছে। গ্রাহকদের কাছ থেকে যে পরিমাণ উৎসে কর কাটা হয়েছে তার তুলনায় অনেক কম অর্থ এনবিআরের অনুকূলে জমা দেওয়া হয়েছে।
শুধু এই পাঁচ ব্যাংক নয়, দেশের প্রায় সব ব্যাংকের ক্ষেত্রেই গ্রাহকের কাছ থেকে কাটা উৎসে কর সময়মতো সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তদারকি ও নির্দেশনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এনবিআর।
কেন কর পরিশোধ করা যাচ্ছে না
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, হিসাবপত্রে বড় অঙ্কের আমানত দেখা গেলেও বাস্তবে সেই অর্থ ব্যাংকের তহবিলে নেই। আগের মালিকপক্ষের সময়ে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ হওয়ায় ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সংকটে রয়েছে। ফলে করের দাবি মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত পাচ্ছেন। তাই বড় অঙ্কের কর একসঙ্গে পরিশোধের সক্ষমতা ব্যাংকগুলোর নেই।
ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগের আইন উপদেষ্টা জানান, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ অনুযায়ী সরকারের কর দাবি পাওনাদারদের অগ্রাধিকার তালিকায় অপেক্ষাকৃত নিচের স্তরে থাকায় এ ক্ষেত্রে আইনি জটিলতাও রয়েছে।
ইউনিয়ন ব্যাংকের প্রশাসক বলেন, অনেক গ্রাহকের এফডিআরের প্রায় ৯০ শতাংশ ঋণের বিপরীতে লিয়েন করা থাকলেও এনবিআর পুরো আমানতের ওপর কর দাবি করছে যা বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে এক্সিম ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে। একই সময়ে আমানতের মুনাফা শরিয়াভিত্তিক পুনঃসমন্বয় করায় আগে নির্ধারিত আয়কর ও উৎসে করও নতুন করে হিসাব করার প্রয়োজন রয়েছে।
হিসাব জব্দ নিয়ে আপত্তি
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গ্রাহকদের কর বকেয়ার কারণে বিভিন্ন শাখা ব্যবস্থাপকের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গভর্নর প্রশ্ন তোলেন, ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের দায় কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে বহন করা কতটা যৌক্তিক।
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, তারা বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছেন। তবে আলোচনা শেষে কর্মকর্তাদের স্বার্থ বিবেচনায় ব্যক্তিগত হিসাব জব্দের নির্দেশ প্রত্যাহারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এনবিআর সম্মত হয়।
গভর্নরের পর্যবেক্ষণ
গভর্নর জানতে চান, করের পরিমাণ বা কর দাবির বৈধতা নিয়ে ব্যাংকগুলোর কোনো আপত্তি আছে কি না। জবাবে প্রশাসকরা জানান, কর দাবির বৈধতা বা পরিমাণ নিয়ে তাদের আপত্তি নেই। বর্তমান আর্থিক অবস্থা ও রেজল্যুশন সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণেই কর পরিশোধে সমস্যা হচ্ছে। এক্সিম ব্যাংকের পক্ষ থেকে কর পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাবের বিষয়ে গভর্নর বলেন, যথাযথ হিসাবের মাধ্যমে অতিরিক্ত বা ভুলভাবে নির্ধারিত কর পুনঃসমন্বয় করা যেতে পারে।
তিনি জানান, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যকর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা অথচ আমানতকারীদের দাবি প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকটির মালিকানা সরকারের হাতে। ফলে এই ব্যাংক থেকে আদায়কৃত রাজস্ব কার্যত সরকারের একটি তহবিল থেকে আরেকটি তহবিলে অর্থ স্থানান্তরের মতো। বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে এনবিআরকে জানানো হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
গভর্নর আরও বলেন, কোনো গ্রাহকের হিসাব বিবরণীতে বড় অঙ্কের আমানত দেখালেও রেজল্যুশন স্কিম অনুযায়ী বাস্তবে তিনি সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকাই তুলতে পারছেন। তাই এই সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় না নিয়ে কর দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না।
বৈঠকে চার সিদ্ধান্ত
বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর চারটি সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমত, রেজল্যুশনের আওতাধীন ব্যাংকগুলো গ্রাহকের প্রকৃত উত্তোলনযোগ্য আমানতের তথ্য এনবিআরকে জানাবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে কর দাবি পুনর্বিবেচনা বা পুনঃসমন্বয় করা হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগ (বিআরডি) পাঁচ ব্যাংকের কর-সংক্রান্ত সব তথ্য সংগ্রহ করে গভর্নরের কাছে উপস্থাপন করবে। পরে এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করে গ্রহণযোগ্য সমাধান খোঁজা হবে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগ নিশ্চিত করবে, সব ব্যাংক গ্রাহকের হিসাব থেকে কাটা উৎসে কর আইন অনুযায়ী পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দিচ্ছে। চতুর্থত, গ্রাহকের কর বকেয়ার কারণে যেসব শাখা ব্যবস্থাপকের ব্যক্তিগত হিসাব জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তা প্রত্যাহারে এনবিআর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।