Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 03:39 am

যশোরে হামের প্রকোপ না কমতেই, বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ

image

যশোর প্রতিনিধি: জেলায় হামের সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসতেই নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ডেঙ্গু। বর্ষার শুরুতেই আক্রান্তের যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে, তাতে স্বাস্থ্য বিভাগ যেমন সতর্ক, তেমনি উদ্বিগ্ন চিকিৎসকরাও। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছেছে। বিশেষ করে জুনের পর মাত্র ২৮ দিনের ব্যবধানে নতুন করে ৯০ জন আক্রান্ত হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, জুলাই থেকে নভেম্বরই যশোরে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। যশোর ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল এবং জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৮ জুলাই পর্যন্ত যশোরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১৭৫ জন। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৯৩। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আক্রান্ত প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। শুধু তাই নয়, গত ১০ জুন পর্যন্ত আক্রান্ত ছিলেন ৮৫ জন। এরপর মাত্র ২৮ দিনেই নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন আরও ৯০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও তিনজনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। বুধবার পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ১৩ জন। তাদের মধ্যে একজন যশোর জেনারেল হাসপাতালে এবং ১২ জন অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত চার বছরে (২০২২-২০২৬) যশোরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৬৫০ জন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ২৭ জন। আর ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের ৮ জুলাই পর্যন্ত জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৭০৭ জনে। এই পরিসংখ্যানই বলছে, যশোরে ডেঙ্গু আর মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে প্রথম মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে যশোরে। গত ৪ জুলাই উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা যান অভয়নগরের নওয়াপাড়া মডেল কলেজ এলাকার বাসিন্দা সোহেল হোসেন (২৯)।

বর্তমানে যশোর সদর, অভয়নগর ও বাঘারপাড়া উপজেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৫৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন অভয়নগর উপজেলায়। যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন পাঁচজন এবং বাঘারপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন তিনজন। এছাড়া ১৩ জন ভর্তি না হয়েই হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন। অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলিমুর রাজিব বলেন, "অভয়নগর দীর্ঘদিন ধরেই ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকির এলাকা। জলাবদ্ধতা, শিল্পাঞ্চল, মোংলা-বেনাপোল করিডোর এবং নৌবন্দরকেন্দ্রিক মানুষের ব্যাপক চলাচলের কারণে এখানে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন। এরপরও জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং চিকিৎসা প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে।"

যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত বলেন, "অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখে হাসপাতালকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রোগীর চাপ বাড়লে বিশেষ ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হবে। প্রয়োজনীয় বেড, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেওয়া যায়।"

ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, "বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। জেলার সব হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাসাবাড়ির ছাদ, ফুলের টব, ফ্রিজের ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার কিংবা যেকোনো পাত্রে পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।" চিকিৎসকদের পরামর্শ, জ্বরকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করানো উচিত। টানা জ্বর, তীব্র শরীর ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমি, পেটব্যথা কিংবা রক্তক্ষরণের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

এদিকে, ডেঙ্গুর পাশাপাশি হাম পরিস্থিতিও পুরোপুরি শেষ হয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত জেলায় ৪৫ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৯ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং ৩৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। গত ২৪ ঘণ্টায়ও নতুন একজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত হামে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। বর্ষার এই সময়ে সাধারণ মানুষের সর্বোচ্চ সতর্কতাই এই দুই রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার বড় সুরক্ষা হতে পারে বলে মনে করছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

 —জা. অর্থনীতি/এলএটি