Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 03:45 am

অযত্নে-অবহেলায় বিলীনের পথে শতবর্ষী জমিদার বাড়ি

image

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার ঐতিহাসিক ধলা জমিদার বাড়িটি আজ চরম অবহেলা, অযত্ন ও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের মুখে পড়েছে। একসময়ের প্রভাবশালী এই জমিদার বাড়ির অধিকাংশ স্থাপনাই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে অবশিষ্ট যে কয়েকটি জরাজীর্ণ ভবন রয়েছে, সেগুলো ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে ঐতিহ্যবাহী এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাটি পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাড়াইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিলা আক্তার ঐতিহ্যটি রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

স্থানীয় ও ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, বাংলা ১৩৩১ সালে তৎকালীন জমিদার গিরিশ চন্দ্র পাল বর্তমান নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার কাটল বাড়ির জমিদারদের কাছ থেকে তিন আনা জমিদারি ক্রয় করেন। এর দুই বছর পর, বাংলা ১৩৩৩ সালে তিনি তাড়াইল উপজেলার ধলায় এই দৃষ্টিনন্দন জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করেন। স্থানীয় প্রবীণদের মুখে প্রচলিত আছে, এই রাজকীয় বাড়িটির উদ্বোধনের সময় আনন্দ উৎসবে প্রায় ৪০ মণ মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছিল।

একসময় পাঁচটি মূল ভবন, একটি পারিবারিক উপাসনালয় (মন্দির), দুটি শানবাঁধানো পুকুর, একটি বিশাল দিঘি, প্রধান ফটকে সিংহদ্বার ও বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ নিয়ে গড়ে উঠেছিল এই ধলা জমিদার বাড়ি। বর্তমানে এর মধ্যে মাত্র তিনটি ভবন কোনোমতে টিকে থাকলেও সেগুলো অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। ভবনের দেয়াল ও ছাদের প্লাস্টার খসে পড়ছে, গজিয়েছে পরগাছা। চারপাশ আগাছা ও আবর্জনায় ঢেকে যাওয়ায় এটি এখন এক ভূতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। জমিদার বাড়ির ভেতরে এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে রেললাইনের মতো শতবর্ষী মোটা লোহার পাত। দীর্ঘদিন ধরে খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে পড়ে থাকায় সেগুলোতে মরিচা ধরে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয়দের মাঝে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, জমিদার গিরিশ চন্দ্র পাল এলাকায় একজন কঠোর ও বর্ণবাদী জমিদার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার শাসনামলে নিম্নবর্ণের মানুষের চলাচল ও শিক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যমূলক বিধিনিষেধ ছিল। তবে এসব তথ্য মূলত স্থানীয় জনশ্রুতি, এ বিষয়ে পর্যাপ্ত কোনো লিখিত ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায়নি।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর জমিদার গিরিশ চন্দ্র পালের পরিবার সব ফেলে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় চলে যান। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে এই জমিদার বাড়ির একটি পরিত্যক্ত ভবনেই ধলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। বর্তমানে এই জমিদার বাড়ির সামনের খোলা জায়গায় ধলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ধলা ইউনিয়ন পরিষদ ও ধলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নতুন ভবন নির্মাণ করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, এই পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িতেই প্রথম ধলা ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়েছিল।

স্থানীয় বাসিন্দা পল্লব পাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ধলা জমিদার বাড়িটি আমাদের এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিন ধরে কোনো সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় ভবনগুলো ধীরে ধীরে ধসে যাচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ একটু উদ্যোগ নিলে এই অমূল্য সম্পদটি রক্ষা করা সম্ভব।”

তাড়াইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিলা আক্তার এ বিষয়ে বলেন, "তাড়াইল উপজেলার ধলা জমিদার বাড়িটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য দ্রুত প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।" স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পর্যটনের বিকাশে এই শতবর্ষী জমিদার বাড়িটি টিকিয়ে রাখা জরুরি।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি