Print Date & Time : 15 October 2026 Thursday 04:46 am

কায়কোবাদ ও মহাশ্মশান: বাংলা মহাকাব্যের অন্তিম মহিমা

image

আশির দশকে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য পড়তে আসি, তখন মহাকবি কায়কোবাদের ‘মহাশ্মশান’ কাব্য নিয়ে এক ধরনের গল্প প্রচলিত ছিল। গল্পটি নিছক সাহিত্যিক রসিকতা ছিল না; এর মধ্যে লুকিয়ে ছিল একটি সাংস্কৃতিক পক্ষপাত এবং সাহিত্য-ইতিহাস সম্পর্কে এক ধরনের অবহেলা। শ্রেণিকক্ষে এক শিক্ষক নাকি ‘মহাশ্মশান’ হাতে নিয়ে ছাত্রদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘বল তো, এটি মহাকাব্য কেন?’ তারপর নিজেই উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এর আকার দেখে বুঝতে পারছ না?’

উক্তিটি একদিকে ব্যঙ্গাত্মক হলেও অন্যদিকে মহাকাব্যের একটি প্রাথমিক বৈশিষ্ট্যের দিকেই ইঙ্গিত করে— তার বৃহৎ পরিসর। ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’, ‘ইলিয়াড’, ‘ওডিসি’র মতো বিশ্বখ্যাত মহাকাব্যগুলো আকারে সুবৃহৎ। বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন মহাকাব্য রচনার উদ্যোগ নেন, তখনও আকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য ছিল।

তবে কেবল বৃহৎ আকার কোনো কাব্যকে মহাকাব্য করে তোলে না। মহাকাব্যের বিষয়বস্তু, বিন্যাস ও শৈলীতেও নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সাধারণভাবে মহাকাব্য হলো বৃহৎ আয়তনের বর্ণনামূলক কাব্য, যেখানে কোনো জাতি, সভ্যতা বা মানবসমাজের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, বীরত্বগাথা কিংবা পৌরাণিক-ঐতিহাসিক কাহিনি মহিমান্বিত রূপে উপস্থাপিত হয়। এতে বিস্তৃত কাহিনি, বহু সর্গ, কেন্দ্রে অসাধারণ নায়ক, যুদ্ধ, রাজনীতি, সমাজ, প্রকৃতি ও জনপদের বিস্তৃত চিত্র এবং গম্ভীর ভাষাশৈলী অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ফলে মহাকাব্য কেবল একজন নায়কের কাহিনি নয়; এটি একটি জাতির স্মৃতি, চেতনা ও আদর্শের শিল্পিত প্রকাশ।

মধুসূদন দত্ত তার ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এ প্রচলিত রামায়ণকথাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেন। রাবণ ও মেঘনাদ এখানে ট্র্যাজিক বীর হিসেবে আবির্ভূত হন। এই পুনর্নির্মাণ ঔপনিবেশিক যুগের বাঙালি পাঠকের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য সৃষ্টি করেছিল।
অন্যদিকে কায়কোবাদ দেখাতে চেয়েছিলেন যে ইতিহাসের বাস্তব ঘটনাকেও মহাকাব্যের উপাদানে রূপান্তর করা সম্ভব। নবীনচন্দ্র সেনের পলাশীর যুদ্ধ এবং মধুসূদনের অসম্পূর্ণ প্রয়াসের ধারাবাহিকতায় ‘মহাশ্মশান’ বাংলা মহাকাব্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

বাংলা মহাকাব্যের প্রায় অন্তিম পর্যায়ে রচিত এই কাব্যের বিষয় পৌরাণিক নয়, ঐতিহাসিক— ১৭৬১ সালের পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ। মারাঠা শক্তি ও আহমদ শাহ আবদালীর সংঘর্ষে মারাঠাদের পরাজয় ঘটে এবং সমগ্র উপমহাদেশের রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। কায়কোবাদ এই ইতিহাসকে কেবল যুদ্ধ বৃত্তান্ত হিসেবে উপস্থাপন না করে মানবিক ট্র্যাজেডিতে রূপান্তর করেছেন। ইব্রাহিম কার্দি ও জোহরার প্রেমকাহিনি সংযোজনের মাধ্যমে তিনি কাব্যকে রসঘন ও আবেগময় করে তুলেছেন।

পরবর্তীকালে মুনীর চৌধুরীর কবর নাটকসহ বাংলা সাহিত্যের আরও কিছু রচনায় ‘মহাশ্মশান’-এর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বাংলা মহাকাব্যের ধারায় কায়কোবাদ কতটা সফল— এই বিতর্কের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যচর্চায় তিনি যে আত্মবিশ্বাস, ঐতিহাসিক চেতনা ও শিল্পসাধনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন, সেটি।

অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের মতে, কায়কোবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো ইতিহাসনির্ভর মহাকাব্য রচনা এবং অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনার প্রতিষ্ঠা। উনিশ শতকের অধিকাংশ কাহিনিকাব্য যেখানে পৌরাণিক কাহিনি ও হিন্দু জাতীয়তাবাদী বয়ানকে ভিত্তি করেছিল, সেখানে কায়কোবাদ ইতিহাসকে গ্রহণ করেন এবং হিন্দু-মুসলমান উভয় পক্ষের বীরত্ব ও ট্র্যাজেডিকে সমানভাবে উপস্থাপন করেন। তার দৃষ্টিতে যুদ্ধের ফল ছিল সমগ্র উপমহাদেশের বিপর্যয়।

এই নিরপেক্ষ ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তার সময়ের জন্য সহজ ছিল না। আবদুল মান্নান সৈয়দ উল্লেখ করেন—
‘মহাশ্মশান কাব্যে হিন্দু-মুসলমানের এই মিলিত ব্যবহারকে সেদিন অনেকেই সুনজরে দেখেননি… কিন্তু কায়কোবাদ তবু অটল ছিলেন।’
তার সাহিত্যিক অবস্থান তাই একই সঙ্গে সাহসী ও ব্যতিক্রমী।

তার গীতিকাব্য ‘অশ্রুমালা’ কৈশোরের প্রেমিকা গিরিবালা দেবীকে উৎসর্গ করেছিলেন। সেখানে ব্যক্তিগত আবেগের প্রকাশ বাংলা গীতিকাব্যের এক ভিন্নমাত্রা নির্দেশ করে।

তবে কায়কোবাদের গুরুত্ব কেবল ‘মহাশ্মশান’-এ সীমাবদ্ধ নয়। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যখন বাঙালি মুসলমান সমাজ শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চায় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে ছিল, তখন কায়কোবাদ ছিলেন সেই অন্ধকারে জ্বলা প্রথম দিকের দীপশিখাগুলোর অন্যতম। গদ্যে যেমন মীর মশাররফ হোসেন, তেমনি কবিতায় তিনি মুসলমান সমাজের আধুনিক সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশের পথিকৃৎ।

মাত্র তেরো বছর বয়সে ‘বিরহ বিলাপ’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তার সাহিত্যজীবন শুরু হয়। এরপর ‘কুসুমকানন’, ‘অশ্রুমালা’, ‘মহাশ্মশান’, ‘অমিয়ধারা’, ‘শ্মশানভস্ম’, ‘মহরম শরীফ’ প্রভৃতি কাব্যের মাধ্যমে তিনি প্রায় আট দশকব্যাপী সাহিত্য সাধনার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। যদিও কেউ কেউ মনে করেন, তার সাহিত্যমান উনিশ শতকীয় রুচির সীমা অতিক্রম করতে পারেনি।

কর্মজীবনে তিনি ছিলেন সাধারণ পোস্টমাস্টার; কিন্তু কাব্যজগতে তিনি নির্মাণ করেন এক বিস্তৃত কল্পলোক। গ্রামবাংলার নিভৃত জীবন থেকে উঠে এসে বাংলা ভাষায় এমন এক কাব্যভুবন নির্মাণ করেন, যা তাকে ‘মহাকবি’ পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

কায়কোবাদের সাহিত্যসাধনার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো তিনি মুসলমান সমাজের আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানকে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার পথে পরিচালিত করেননি। তার কাব্যে মানবতাই চূড়ান্ত সত্য হয়ে উঠেছে।

‘মহাশ্মশান’-এর সেই বিখ্যাত উচ্চারণ আজও বিস্ময় জাগায়—
‘তুমি মুসলমান
আমি হিন্দু, কি পার্থক্য প্রেমের নিকটে?
আমরা মানব, মূর্খ পড়ি ভ্রান্তির ঘোরে,
সৃজিয়াছি জাতিভেদ ধ্বংসের কারণ।’

এই পঙক্তিগুলো কেবল কাব্যিক উচ্চারণ নয়; এগুলো উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে এক মানবতাবাদী ঘোষণা। আজ যখন পরিচয়ের রাজনীতি মানুষের অস্তিত্বকে বিভাজিত করে, তখন কায়কোবাদের কণ্ঠস্বর নতুন অর্থে ফিরে আসে। তিনি মনে করিয়ে দেন— মানুষের পরিচয় শেষ পর্যন্ত মানবতাতেই।

বাংলা কাব্যের ইতিহাসে কায়কোবাদ এক সন্ধিক্ষণের কবি। তিনি একদিকে মধ্যযুগীয় মুসলিম ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করেছেন, অন্যদিকে আধুনিক বাংলা কাব্যের রীতি ও ভাষাকে আত্মস্থ করেছেন। পুথিসাহিত্যের গণ্ডি অতিক্রম করে শুদ্ধ ও আধুনিক বাংলা ভাষায় মুসলমান কবির আত্মপ্রকাশ তার হাত ধরেই সুদৃঢ় ভিত্তি লাভ করে।

কাজী নজরুল ইসলাম এক অনুষ্ঠানে তাকে দেখে আবেগভরে বলেছিলেন— ‘ইনিই মহাকবি কায়কোবাদ সাহেব? আমাদের সকলের গুরু।’
সাহিত্যের বিচারে কায়কোবাদের কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। তিনি মুসলিম কবিদের মধ্যে প্রথম সনেট রচয়িতা, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুসলিম কবি এবং ইতিহাসনির্ভর মহাকাব্যের অন্যতম সফল নির্মাতা।

সময়ের সঙ্গে সাহিত্যিক রুচি বদলায়। তাই মহাশ্মশান আজ হয়তো আগের মতো পাঠকপ্রিয় নয়; কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অম্লান। কারণ এটি শুধু একটি কাব্য নয়— একটি সমাজের আত্মপ্রকাশের দলিল।

কায়কোবাদ বাংলা সাহিত্যের সেই ইতিহাস-সন্ধিক্ষণের কবি, যিনি বাঙালি মুসলমানের আধুনিক সাহিত্যিক আত্মবিশ্বাস নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তার সাহিত্যিক অবদান তাই ইতিহাসের কাছে চিরস্থায়ীভাবে মূল্যবান।