রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন—বাস্তব জীবনের এই চরম সত্যটি যখন স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র সম্পর্কের ওপর গিয়ে পড়ে, তখন এক মুহূর্তের অবিবেচক রাগ পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে। ঝগড়ার এক পর্যায়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এক সাথে ‘তিন তালাক’ উচ্চারণ করে ফেলা আমাদের সমাজে একটি নিত্যদিনের ট্র্যাজেডি। কিন্তু রাগের মাথায় মুখ থেকে বের হওয়া এই একটি শব্দই কি সারাজীবনের ভালোবাসার সম্পর্ককে ছিন্ন করে দেয়, নাকি এখানে ইসলামের কোনো সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ বিধান রয়েছে?
এক সঙ্গে তিন তালাক দেওয়ার শরয়ী বিধান, এর আইনি কার্যকারিতা এবং ইসলামের সুক্ষ্ম সমাধান নিয়ে।
১. এক সঙ্গে তিন তালাক দিয়ে কয়টি কার্যকর হবে?
একই মজলিসে বা এক সঙ্গে তিন তালাক দিলে তা কয়টি তালাক হিসেবে গণ্য হবে, তা নিয়ে আলেমদের মাঝে দীর্ঘকাল ধরে আলোচনা রয়েছে। তবে বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে একটি অনন্য সমাধান পাওয়া যায়।
বিখ্যাত সাহাবী ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে, আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতে এবং উমর (রা.)-এর খিলাফতের প্রথম দুই বছরে এক সঙ্গে তিন তালাককে ‘এক তালাক’ হিসেবেই গণ্য করা হতো।(সুনান আন-নাসায়ী, ৩৪০৯)।
ইসলামের প্রাথমিক যুগের এই নিয়মটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম পরিবার ভেঙে দেওয়ার পক্ষে নয়, বরং ভুল বোঝাবুঝি শুধরে নেওয়ার সুযোগ দিতে চায়।
২. চূড়ান্ত তিন তালাকের ভয়াবহ পরিণতি
ইসলামে তালাককে সবচেয়ে অপ্রিয় হালাল কাজ বলা হয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিরতি দিয়ে বা চূড়ান্তভাবে তিন তালাক দিয়ে ফেলে, তবে স্ত্রী তার জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যায়। (বুখারি, ৪৮৮৭)।
পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী, চূড়ান্ত তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী পুনরায় পূর্বের স্বামীর কাছে ফিরে আসার একমাত্র বৈধ পথ হলো হালালা। সুরা আল-বাকারার ২৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, অতঃপর যদি সে তাকে (তৃতীয়) তালাক দেয়, তবে এরপর সে অন্য স্বামী গ্রহণ না করা পর্যন্ত তার জন্য হালাল হবে না।
৩. শর্তযুক্ত ও বাধ্যতামূলক নিয়ম
রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই ক্ষেত্রে শুধু কাগজের কলমে দ্বিতীয় বিয়ে করলেই হবে না। মা আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রিফায়া কুরাযী (রা.)-এর স্ত্রী দ্বিতীয় বিয়ে করলেও স্বামী সহবাসে অক্ষম ছিলেন। তখন রাসুল (সা.) তাকে প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার অনুমতি না দিয়ে বলেন, তা হবে না, যতক্ষণ না তোমরা একে অপরের শারীরিক স্বাদ আস্বাদন (সহবাস) করবে। ( বুখারি,দ ৪৯৩৫)।
পরবর্তীতে যদি সেই দ্বিতীয় স্বামী স্বেচ্ছায় তালাক দেয় বা মারা যায়, তবেই ইদ্দত পালন শেষে প্রথম স্বামী নতুন মহর ও আকদের মাধ্যমে তাকে পুনরায় বিয়ে করতে পারবে।
তাই আবেগের বশবর্তী হয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইসলামের এই কঠোর বিধান ও অনুশাসন সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। বৈবাহিক জীবনের জটিলতায় মনগড়া ফতোয়া না মেনে, কুরআন-সুন্নাহর সঠিক রেফারেন্স অনুসরণের মাধ্যমেই কেবল একটি সুন্দর সমাজ গঠন সম্ভব।
জা. অর্থনীতি/ উমার