Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 06:38 pm

ভাইরাল ট্রেন্ডের আড়ালে যে সত্য ঢাকা পড়ছে

image

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি একটি রিল ভিডিও তুমুল ভাইরাল। এক তরুণ দামী কফি হাতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলছেন, নো রেসপন্সিবিলিটি, নো ড্রামা—একাই ভালো আছি। ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আর 'সিঙ্গেল লাইফ'-এর গুণকীর্তন করা এই ট্রেন্ড এখন লাখো তরুণের ওয়ালে ওয়ালে ঘুরছে। কিন্তু স্ক্রিনের এই ঝকঝকে স্বাধীনতার পেছনে আসলে কী লুকিয়ে আছে? সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক জরিপ বলছে, এই তথাকথিত স্বাধীন প্রজন্মের বড় অংশই তীব্র মানসিক একাকিত্ব ও বিষণ্ণতায় ভুগছেন।

ভোগবাদী এই যুগে যখন পরিবার প্রথাকে এক প্রকার বোঝা বা স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে, তখন ইসলামের একটি চিরন্তন বিধান মানবমন ও সমাজের ভারসাম্য রক্ষায় এক অনন্য সমাধান হিসেবে সামনে এসেছে। তা হলো—বিবাহ।

ভার্চুয়াল দুনিয়ায় কয়েক হাজার অনুসারী থাকলেও, দিনশেষে মানুষের এমন একজন সঙ্গীর প্রয়োজন হয়, যে তার সুখ-দুঃখের ভাগীদার হবে। পবিত্র কুরআনের সুরা আর-রূমের ২১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ এই মনস্তাত্ত্বিক চাহিদার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, তিনি আমাদের মধ্য থেকেই আমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে আমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পারি এবং পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া তৈরি করে দিয়েছেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ে কেবল দুটি পরিবারের মেলবন্ধন বা কোনো সামাজিক চুক্তি নয়; এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগীয় আশ্রয়স্থল। আধুনিক সমাজ যেখানে মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক হতে শেখায়, বিয়ে সেখানে মানুষকে দায়িত্বশীল ও সহনশীল করে তোলে।

আজকের উন্মুক্ত ইন্টারনেটের যুগে চোখের সামনে প্রতিনিয়ত অবাধ্যতা আর চারিত্রিক স্খলনের হাতছানি। এই অনৈতিকতার জোয়ার থেকে নিজেকে বাঁচানোর সবচেয়ে বড় ঢাল হলো বিয়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন কোনো বান্দা বিয়ে করে, তখন সে তার দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করে। (মুসতাদরাক হাকেম)

ইসলাম মানুষের জৈবিক চাহিদাকে অস্বীকার বা দমন করতে বলে না, বরং তাকে একটি পবিত্র ও আইনি কাঠামোর মধ্যে রূপান্তর করার নির্দেশ দেয়। বিয়ে মানুষের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং চরিত্রকে কলুষতা থেকে রক্ষা করে। এটি কোনো সেকেলে ধারণা নয়, বরং বর্তমান যুগে মানসিক ও নৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার সবচেয়ে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়।

আজকের তরুণ প্রজন্মের বিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার বা পিছিয়ে দেওয়ার অন্যতম বড় কারণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা। আগে নিজে প্রতিষ্ঠিত হই, তারপর বিয়ে—এই ধারণাই এখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত। অথচ ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ উল্টো। সুরা আন-নুরের ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, তারা যদি দরিদ্র হয়, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সচ্ছল করে দেবেন।

ইসলাম শেখায়, বিয়ে কোনো আর্থিক বোঝা নয়, বরং তা পরিবারে বরকত ও হালাল উপার্জনের নতুন দুয়ার খুলে দেয়। বিয়ে মানুষকে অলসতা থেকে বের করে জীবনকে সুশৃঙ্খল করতে বাধ্য করে, যা পরোক্ষভাবে মানুষের পেশাদারী জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সোশ্যাল মিডিয়ার সাময়িক ট্রেন্ড তরুণদের ক্ষণস্থায়ী স্বাধীনতার লোভ দেখাতে পারে, কিন্তু তা জীবনের শেষ বয়সের একাকিত্ব আর শূন্যতা ঢাকতে পারে না। তবে ইসলাম অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ধর্ম; সামর্থ্য বা বাস্তব পরিস্থিতির কারণে কারো বিয়েতে বিলম্ব হলে ইসলাম তাকে অপরাধী করে না। কিন্তু সামর্থ্য থাকার পরও যারা পশ্চিমা ভোগবাদের প্রভাবে বিয়ে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, তারা মূলত জীবনের এক বিশাল নেয়ামত থেকে নিজেদের বঞ্চিত করছেন।

দিনশেষে, স্ক্রিনের সস্তা লাইক-কমেন্ট নয়, একটি সুন্দর পরিবার এবং হালাল ভালোবাসাই মানুষের জীবনকে পরিপূর্ণতা দেয়।

জা. অর্থনীতি/ উমার