আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বিওজি) বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ৩১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সুদের হার বাড়িয়েছে। বিবিসির খবর।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) ব্যাংক অব জাপান তাদের নীতিগত সুদের হার ০.৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করেছে, যা ১৯৯৫ সালের পর সর্বোচ্চ।
এই সিদ্ধান্ত এমন সময় এসেছে যখন বিশ্বের কিছু অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সুদের হার বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
১৯৯০-এর দশকে সম্পদমূল্য- বিশেষ করে বাড়ি ও শেয়ারের দাম ধসে পড়ার পর জাপানে সুদের হার ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর প্রায় দুই দশক ধরে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির থাকায় সুদের হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি ছিল।
২০২৪ সালের মার্চ থেকে ব্যাংকটি ধীরে ধীরে সুদের হার বাড়াতে শুরু করে। তখন এটি ছিল ১৭ বছরের মধ্যে প্রথম সুদহার বৃদ্ধি।
জাপানবিষয়ক অর্থনীতিবিদ জেসপার কোল বিবিসিকে বলেন, “২০ বছরের মূল্যপতনের (ডিফ্লেশন) পর জাপান এখন মূল্যস্ফীতির একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “জরুরি বা সংকটকালীন মুদ্রানীতির আর প্রয়োজন নেই, এবং বিওজি এখন স্বাভাবিক নীতিতে ফিরে যেতে চায়।”
জাপানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ব্যাংকটির ওপর চাপ বাড়ছে, যা সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত অত্যন্ত কম ছিল।
উচ্চ জ্বালানির দাম মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিচ্ছে, ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল জাপানের মতো দেশগুলো বেশি চাপে পড়ছে।
মে মাসে জাপানের পাইকারি দাম আগের বছরের তুলনায় ৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি।
তবে এপ্রিল মাসে দেশটির সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ব্যাংকের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার নিচে রয়েছে।
বিওজি মঙ্গলবার জানায়, ইরান-সংক্রান্ত যুদ্ধের কারণে জাপানের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকিতে নেই, কারণ সরকার উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব কমাতে পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে ব্যাংকটি সতর্ক করে বলেছে, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়ছে, ফলে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার ওপরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সুদের হার বাড়ানো একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও অন্যদিকে ঋণের খরচ বাড়ায়, যা সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
ব্যাংকের গভর্নর কাজুও উয়েদা চিকিৎসার কারণে এ সপ্তাহের বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি এবং অন্যান্য নীতিনির্ধারকরা সুদের হার বৃদ্ধির বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছেন।
চলতি মাসের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত হলেও যদি দেখা যায় মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি অর্থনৈতিক দুর্বলতার চেয়ে বেশি, তাহলে সুদের হার বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি, যিনি ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে পরিচিত, আগে সুদের হার বাড়ানোর ধারণার বিরোধিতা করেছিলেন। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চাপের মধ্যেও তিনি সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে সমালোচনা করেননি।
তাকাইচি দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি বিওজির দ্বিতীয় সুদহার বৃদ্ধি, যা আগে থেকেই প্রত্যাশিত ছিল। এর আগে ডিসেম্বরে সুদের হার প্রায় ০.৭৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছিল।
সুদের হার বৃদ্ধির আরেকটি উদ্দেশ্য হলো ইয়েনকে স্থিতিশীল করা, যা মার্কিন ডলার ও ইউরোর বিপরীতে চাপের মধ্যে রয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উলরিক শ্যাডে বলেন, বাজারে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে ইয়েন খুবই দুর্বল, তাই এটিকে কিছুটা শক্তিশালী করার পদক্ষেপ ক্ষতিকর নয়।
তবে এই বৃদ্ধির পরও জাপানের সুদের হার অন্যান্য বড় অর্থনীতির তুলনায় অনেক কম।
উদাহরণ হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে সুদের হার ৩ শতাংশের বেশি। তবে সেখানকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও আপাতত হার অপরিবর্তিত রাখার দিকে ঝুঁকছে।
অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ সুদের হার স্থির রেখেছে, তবে প্রয়োজন হলে আবারও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধীরগতির একটি পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিতে পারে।
—জা. অর্থনীতি/এআইই