Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 06:16 am

ফাইভ স্টার জেনারেল ম্যাথিউস

image

বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে কিছু নাম কেবল পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং সময়কে অতিক্রম করে এক ধরনের মানদণ্ডে পরিণত হয়। তেমনই এক নাম লোথার ম্যাথিউস। বিশ্বকাপে ২৫টি ম্যাচ খেলে তিনি এখনও সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ডধারী। পাঁচটি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া এই জার্মান তারকার পাশে কেবল একজনই আছেন, মেক্সিকোর গোলকিপার অ্যান্তোনিও কারবাহাল, যিনি একই বিরল কীর্তির অংশীদার।

ম্যাথিউসকে নিয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী স্বীকৃতিগুলোর একটি এসেছে ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনার কাছ থেকে। নিজের বইতে ম্যারাডোনা তাকে উল্লেখ করেছেন নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে। এমনকি তিনি বলেছেন, ‘আমার বিপক্ষে খেলা সবচেয়ে ভয়ানক ফুটবলার ম্যাথিউস।’ এই স্বীকৃতি তাকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যায়, কারণ প্রতিপক্ষের চোখেই তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ এক ফুটবলার।

ম্যাথিউসের ক্যারিয়ার শুরু হয় মাঝমাঠ থেকে। কখনও আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার, কখনও রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার-তার ভূমিকা বদলালেও খেলায় প্রভাব কখনও কমেনি। পরে তাকে দেখা যায় সুইপার ভূমিকায়, যেখানে রক্ষণ ও মাঝমাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পুরো খেলা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এই অবস্থানটি আধুনিক ফুটবলে “লিবারো” নামে পরিচিত এবং ম্যাথিউস সেই পজিশনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। পুরো মাঠজুড়ে তার উপস্থিতি, নিখুঁত পাস, দ্রুত ট্যাকলিং এবং অসাধারণ ম্যাচ রিডিং তাকে পরিণত করেছে এক পূর্ণাঙ্গ ফুটবলারে।

তার শট ছিল প্রবল শক্তিশালী-অনেকে বলেন কামানের গোলার মতো। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিখুঁত ট্যাকল করার ক্ষমতা তাকে প্রতিপক্ষের জন্য ভয়ের কারণ বানাত। এসব গুণের ফলেই তিনি জিতেছেন ইউরোপের বর্ষসেরা খেলোয়াড় এবং ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। এমনকি ৩৮ বছর বয়সেও তিনি জার্মানির সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন যা তার দীর্ঘস্থায়ী শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ।

বিশ্বকাপেই ম্যাথিউসের কিংবদন্তি সবচেয়ে উজ্জ্বল। তিনি পাঁচটি বিশ্বকাপে অংশ নেন- ১৯৮২ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত। ১৯৮২ সালে প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিনি জার্মানির ফাইনালে পৌঁছাতে সাহায্য করেন, যদিও দলটি ইতালির কাছে হেরে রানার্সআপ হয়। ১৯৮৬ সালে আবারও ফাইনালে পৌঁছে তারা আর্জেন্টিনার কাছে হারে। কিন্তু ১৯৯০ সালে তিনি অধিনায়ক হিসেবে ইতিহাস গড়েন-আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে জার্মানিকে বিশ্বকাপ জেতান এবং ট্রফি হাতে তোলেন।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে একীভূত জার্মানির হয়ে তিনি খেলেন সুইপার হিসেবে। বুলগেরিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে একটি গুরুত্বপূর্ণ গোলও করেন যা তাকে বিশ্বকাপ ইতিহাসে ২১ ম্যাচ খেলার রেকর্ডে ভাগ বসাতে সাহায্য করে। তবে সেই ম্যাচেই জার্মানি অঘটনের শিকার হয়ে বিদায় নেয়। এরপর জাতীয় দলে তার জায়গা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং কিছু সময় তিনি দল থেকে দূরে থাকেন।

তবুও ফুটবল তাকে শেষ পর্যন্ত ডাক দেয়। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে তিনি অবিশ্বাস্যভাবে ফিরে আসেন এবং দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে পাঁচটি বিশ্বকাপে খেলার কীর্তি গড়েন। একই সঙ্গে তিনি ২৫ ম্যাচ খেলে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার একক রেকর্ড গড়ে বিদায় নেন। এরপর আর কেউ সেই রেকর্ড ভাঙতে পারেনি।

তার সঙ্গে দীর্ঘ বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে খুব কম ফুটবলারেরই তুলনা চলে। মেক্সিকোর অ্যান্তোনিও কারবাহাল, চিলির এলিয়াস ফিগুয়েরোয়া, ইতালির জিউসেপ্পে বার্গোমি, ক্যামেরুনের রিগোবার্ট সং এবং মেক্সিকোর হুগো সানচেজ- এদের মতো কয়েকজনই দীর্ঘ সময় বিশ্বমঞ্চে টিকে ছিলেন।

ম্যাথিউসের ক্লাব ক্যারিয়ারও সমান উজ্জ্বল। ১৯৯১ সালে তিনি ফিফার প্রথম বর্ষসেরা খেলোয়াড় হন আর ১৯৯০ সালে জেতেন ব্যালন ডি’অর। ইউরো ১৯৮০ জয়ের দলেও ছিলেন তিনি। জার্মান জাতীয় দলের হয়ে ১৫০ ম্যাচে ২৩ গোল করেন যা একজন মিডফিল্ডার বা সুইপারের জন্য অসাধারণ অর্জন।

তার গল্প আসলে শুধু একজন ফুটবলারের গল্প নয় বরং দীর্ঘ সময় ধরে শীর্ষে টিকে থাকার এক বিরল উদাহরণ। বিশ্বকাপ ইতিহাসে লোথার ম্যাথিউস যেন এক ফাইভ স্টার জেনারেল- যার নেতৃত্ব, ধারাবাহিকতা আর বহুমুখী দক্ষতা আজও তুলনার বাইরে।

তার রেকর্ড ভাঙবে কি না, সেটা সময়ই বলবে। তবে এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ ইতিহাসে তার অবস্থান একেবারে একা-অটুট, অবিসংবাদিত এবং কিংবদন্তির মতো স্থায়ী!

একনজরে
পুরো নাম: লোথার হারবার্ট ম্যাথিউস
জন্ম: ২১ মার্চ ১৯৬১ (বয়স ৫০)
জন্মস্থান: আরসাঙ্গেন, পশ্চিম জার্মানি
উচ্চতা: ৫ ফিট ৯ ইঞ্চি
পজিশন: বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার, সুইপার
জার্মানি ক্যারিয়ার: ১৫০ ম্যাচ, ২৩ গোল
বিশ্বকাপ: ১৯৯০ সালে চ্যাম্পিয়ন, দুবার রানার্সআপ (১৯৮২, ১৯৮৬)
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ৫ বার (১৯৮২-১৯৯৮ টানা)
ইউরো: একবার (১৯৮০)
ব্যক্তিগত অর্জন: ব্যালন ডি’অর (১৯৯০), 
ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার (১৯৯১)।