রূপকথা তারিক জারা: ১৯৩০ সালের বিশ্বকাপ-ফুটবল ইতিহাসের এক নতুন ভোর! আর সেই সূর্যোদয়ের কেন্দ্রে ছিল ছোট্ট দেশ উরুগুয়ে। আজকের প্রজন্মের কাছে হয়তো উরুগুয়ে কেবল লুইস সুয়ারেজ, এডিনসন কাভানি কিংবা দিয়েগো ফোরলানের দেশ। কিন্তু একসময় বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ংকর শক্তির নামই ছিল উরুগুয়ে। সেই স্বর্ণযুগের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন এক দুর্ধর্ষ অধিনায়ক-হোসে নাসাজ্জি; যাকে ফুটবল বিশ্ব চিনত ‘দ্য গ্রেট মার্শাল’ নামে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৯৩০ সালে। প্রথম আসরের আয়োজক ছিল উরুগুয়ে। নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে উরুগুয়ে শুধু অংশই নেয়নি, বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিল ফুটবল কীভাবে আধিপত্যের ভাষা হয়ে উঠতে পারে। ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে তারা। আর সেই ঐতিহাসিক দলের অধিনায়ক ছিলেন নাসাজ্জি-বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ট্রফি উঁচিয়ে ধরা অধিনায়ক।
আজকের দিনে তার নাম হয়তো খুব বেশি উচ্চারিত হয় না। অথচ উরুগুয়ের ফুটবল ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায়, নাসাজ্জি কেবল একজন ফুটবলার ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি যুগের প্রতীক। উরুগুয়ের অনেক ফুটবলবোদ্ধা এখনও মনে করেন, দেশটির ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ফুটবলার তিনিই।
বিশ্বকাপের আগে থেকেই উরুগুয়ে ছিল বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি। ১৯২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিক এবং ১৯২৮ সালের আমস্টারডাম অলিম্পিকে ফুটবলে স্বর্ণ জিতেছিল তারা। এছাড়া ১৯২৩, ১৯২৪ ও ১৯২৬ সালে জিতেছিল কোপা আমেরিকা। অর্থাৎ বিশ্বকাপ শুরুর আগেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে উরুগুয়ের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর সেই সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন নাসাজ্জি।
ইতালীয় বংশোদ্ভূত এই ফুটবলারের পরিবার ইতালির মিলান থেকে পাড়ি জমিয়েছিল উরুগুয়েতে। কেন এসেছিল, তার নির্দিষ্ট তথ্য জানা যায় না। হয়তো জীবিকার সন্ধানে। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের জন্য সেটি ছিল আশীর্বাদ। কারণ সেই অভিবাসী পরিবারেই ১৯০১ সালের ২৪ মে, মন্টেভিডিও শহরে জন্ম নেন হোসে নাসাজ্জি ইয়ার্জা।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে ক্লাব ফুটবল শুরু করেন তিনি। ১৯১৮ সালে স্বদেশি ক্লাব লিতোতে তার অভিষেক হয়। জাতীয় দলে ডাক পান ১৯২৩ সালে। এরপর টানা প্রায় দেড় দশক উরুগুয়ের জার্সিতে খেলেছেন। ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন ৫১টি ম্যাচ। তবে সংখ্যার চেয়ে বড় ছিল তার নেতৃত্ব, ব্যক্তিত্ব এবং প্রভাব।
রাইট ব্যাক পজিশনে খেললেও নাসাজ্জি ছিলেন পুরো দলের প্রাণশক্তি। প্রায় ছয় ফুট উচ্চতার এই ডিফেন্ডার হেডে ছিলেন দুর্দান্ত। দুই পায়েই ছিল শক্তিশালী শট নেওয়ার ক্ষমতা। প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকারদের জন্য তিনি ছিলেন এক দুঃস্বপ্ন। রক্ষণভাগ আগলে রাখতেন সেনাপতির মতো। সেখান থেকেই জন্ম নেয় তার বিখ্যাত উপাধি— দ্য গ্রেট মার্শাল’।
১৯৩০ সালের বিশ্বকাপে উরুগুয়ের অভিযানও ছিল দুর্দান্ত। গ্রুপ পর্বে তারা হারায় পেরু ও রোমানিয়াকে। এরপর সেমিফাইনালে সাবেক যুগোস্লাভিয়াকে ৬-১ গোলে উড়িয়ে দেয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় নাটক অপেক্ষা করছিল ফাইনালে।
মন্টেভিডিওর ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামে ফাইনালের প্রথমার্ধ শেষে ২-১ গোলে পিছিয়ে ছিল উরুগুয়ে। গ্যালারিতে তখন স্তব্ধতা। কিন্তু বিরতির পর বদলে যায় দৃশ্যপট। অধিনায়ক নাসাজ্জির অনুপ্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে দ্বিতীয়ার্ধে আরও তিন গোল করে উরুগুয়ে। শেষ পর্যন্ত ৪-২ গোলের জয়ে ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ নিজেদের করে নেয় তারা। আর নাসাজ্জি অমর হয়ে যান ইতিহাসে।
১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি উরুগুয়ে। ফলে সেই আসরে খেলাও হয়নি নাসাজ্জির। তবে ১৯৩৫ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতান তিনি। জাতীয় দলের হয়ে মোট সাতটি বড় ট্রফি জিতেছিলেন-একটি বিশ্বকাপ, দুটি অলিম্পিক স্বর্ণ এবং চারটি কোপা আমেরিকা। ১৯২৩ ও ১৯৩৫ সালের কোপা আমেরিকায় নির্বাচিত হন টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলারও।
১৯৩৭ সালে জাতীয় দল থেকে অবসর নিলেও ফুটবল ছাড়েননি নাসাজ্জি। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত উরুগুয়ে জাতীয় দলের কোচের দায়িত্বও পালন করেন। খেলোয়াড়ি জীবনের মতো কোচ হিসেবেও দলের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন গভীরভাবে।
১৯৬৮ সালের ১৭ জুন, ৬৭ বছর বয়সে মন্টেভিডিওতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি। কিন্তু মৃত্যু তার নাম মুছে দিতে পারেনি। বিশ্বকাপের প্রথম অধিনায়ক, উরুগুয়ের প্রথম মহাতারকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে হোসে নাসাজ্জির নাম আজও ফুটবল ইতিহাসে লেখা আছে স্বর্ণাক্ষরে!
একনজরে
# পুরো নাম: হোসে নাসাজ্জি ইয়ার্জা
* জন্ম: ২৪ মে ১৯০১, মন্টেভিডিও, উরুগুয়ে
* মৃত্যু: ১৭ জুন ১৯৬৮
* উচ্চতা: ৫ ফুট সাড়ে ১১ ইঞ্চি
* পজিশন: রাইট ব্যাক
* জাতীয় দল: ১৯২৩-১৯৩৭
* বিশ্বকাপ জয়: ১৯৩০
* অলিম্পিক স্বর্ণ: ১৯২৪, ১৯২৮
* কোপা আমেরিকা জয়: ১৯২৩, ১৯২৪, ১৯২৬, ১৯৩৫
* জাতীয় দলের ম্যাচ: ৫১
* ডাকনাম: ‘দ্য গ্রেট মার্শাল’
* সেরা ফুটবলার: কোপা আমেরিকা ১৯২৩, ১৯৩৫।