Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 07:23 pm

‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে ‘হেডবাট’

image

শাওন রহমান: ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু সৌন্দর্য, গোল কিংবা ট্রফির গল্প নয়। এটি বিতর্কেরও ইতিহাস। কখনও এক মুহূর্ত একজন ফুটবলারকে কিংবদন্তি বানিয়ে দেয় আবার কখনও একই মুহূর্ত তার ক্যারিয়ারে রেখে যায় স্থায়ী দাগ। ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং জিনেদিন জিদানের ‘হেডবাট’, বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত দুই ঘটনার মধ্যে অন্যতম। একটি ছিল প্রতারণার অভিযোগে ঘেরা অন্যটি ক্ষণিকের রাগে ভেঙে যাওয়া বিদায়ের গল্প। 

১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। চার বছর আগে দুই দেশের ফকল্যান্ড যুদ্ধের কারণে এই ম্যাচে রাজনৈতিক আবহও ছিল তীব্র। মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে সেই উত্তেজনার মধ্যেই জন্ম নেয় বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বিখ্যাত গোল বিতর্ক।  

২২ জুনের সেই ম্যাচ তখনও গোলশূন্য ড্র। ৫১তম মিনিটে দলকে বিপদমুক্ত করতে গিয়ে উল্টো বিপদে ফেলেন ইংল্যান্ডের স্টিভ হজ। তার ভুল থেকে উড়ে আসা বলে গোলরক্ষক পিটার শিল্টনের সঙ্গে লাফ দেন ম্যারাডোনা। প্রথম দেখায় মনে হয়েছে আর্জেন্টাইন তারকা হেড দিয়ে বলকে জালে পাঠিয়েছে। তবে রিপ্লেতে স্পষ্ট দেখা যায়, হাত দিয়ে বল স্পর্শ করেছিলেন তিনি। কিন্তু তিউনিসিয়ার রেফারি আলি বিন নাসের ও তার সহকারী বোগদান দোচেভ সেটি ধরতে পারেননি। ফলে ফিফার নিয়মে গোলটি বৈধ ঘোষণা করা হয়। 

বিখ্যাত এই বিতর্ক নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে রেফারি নাসের বলেন, তিনি বুঝেছিলেন কিছু একটা অস্বাভাবিক হয়েছে। তবে স্পষ্ট দেখতে না পাওয়ায় ফিফার নিয়ম অনুযায়ী তিনি সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেননি। 

সে ম্যাচের নাটক তখনও শেষ হয়নি। বিতর্কিত গোলের মাত্র চার মিনিট পর মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে ছয় সেরা ফুটবলারকে কাটিয়ে দ্বিতীয় গোল করেন ম্যারাডোনা। তার এই গোলকে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ আখ্যা দেওয়া হয়। অর্থাৎ একই ম্যাচে ম্যারাডোনা হয়ে ওঠেন একদিকে বিতর্কের খলনায়ক অন্যদিকে ফুটবল জাদুর মহারাজ।

ইংল্যান্ডে আজও ‘হ্যান্ড অব গড’ ক্ষোভের প্রতীক। অন্যদিকে আর্জেন্টিনায় এটি অনেকের কাছে কৌশলী প্রতিশোধের গল্প। ম্যারাডোনা নিজেও বলেছিলেন, গোলটিতে ছিল ‘অল্প একটু ম্যারাডোনার মাথা এবং অল্প একটু ঈশ্বরের হাত।’ সেখান থেকেই এই গোলের নাম হয় হ্যান্ড অব গড। 

বিশ্বকাপের চেয়েও আগে বোনের সম্মান 

দুই দশক পর বিশ্বকাপ আরেকটি অবিশ্বাস্য মুহূর্ত দেখে বার্লিনে। ২০০৬ সালের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ইতালি ও ফ্রান্স। এটি ছিল কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের ক্যারিয়ারে শেষ ম্যাচ। ম্যাচের শুরুতে পানেনকা পেনালটি থেকে গোল করে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন তিনি। কিন্তু পরে মার্কো মাতেরাজ্জির গোলে সমতায় ফেরে ইতালি।  

ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে ঘটে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে হতবাক করা মুহূর্তগুলোর একটি। ১১০ মিনিটে মাঠের মাঝখানে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে মাতেরাজ্জির বুকে মাথা দিয়ে আঘাত করেন জিদান। ইতালিয়ান এই ডিফেন্ডার মাটিতে পড়ে গেলেও প্রথমে ঘটনা দেখেননি ম্যাচ রেফারি। পরবর্তীকালে চতুর্থ রেফারির সহায়তায় জিদানকে লাল কার্ড দেখানো হয়।

কয়েক মিনিটের মধ্যে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হতো এমন পরিস্থিতিতে জিদানের হেডবাট কাণ্ডের পেছনে রয়েছে বিশেষ কারণ। ম্যাচ চলাকালীন জিদানকে উত্ত্যক্ত করেন মাতেরাজ্জি। জিদানের আক্রমণ ঠেকাতে বারবার জার্সি টেনে ধরেন ইতালিয়ান ডিফেন্ডার। বিরক্ত হয়ে জিদান বলেছিলেন, জার্সি চাইলে ম্যাচ শেষে দিয়ে দেব। প্রত্যুত্তরে মাতেরাজ্জি বলেন, তোমার জার্সি নয়, তোমার বোনকে পছন্দ করি। বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা থাকলেও ম্যাচে বোনের অপমান মেনে নিতে পারেননি জিদান। 

হেডবাট ঘটনা নিয়ে জিদান জানিয়েছিলেন, তিনি নিজের আচরণে কখনই গর্বিত নন, তবে মাঠে বোনকে নিয়ে অপমান সহ্য করতে পারেননি। মাতেরাজ্জিও স্বীকার করেছিলেন, তিনি জিদানের বোনকে নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। তবে প্রতিপক্ষকে মানসিক চাপ বা উসকে দেওয়ার সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে জিদানের এমন প্রতিক্রিয়া তিনি আশা করেননি। 

জিদানের লাল কার্ডের পর টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ইতালি। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে তাই ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং জিদানের হেডবাট শুধু দুটি বিতর্ক নয়, এগুলো দুই কিংবদন্তির মানবিক দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। একজন নিয়ম ভেঙে ইতিহাস লিখেছিলেন, অন্যজন আবেগের কাছে হার মেনে বিদায় নিয়েছিলেন বিশ্বমঞ্চ থেকে।