সোহম দে: স্টেডিয়ামের আলো তখন আস্তে আস্তে নিভে আসছে। আকাশভরা শব্দ, কোটি কোটি মানুষের চিৎকার, পতাকার ঢেউ—সবকিছুর মাঝেও যেন সময় হঠাৎ থেমে গেছে। ক্যামেরা এগিয়ে যাচ্ছে এক মানুষের দিকে। ছোটখাটো শরীর, শান্ত মুখ, চোখে অদ্ভুত এক নীরব আগুন। যেন তিনি জানেন, এই মুহূর্ত শুধু একটি ম্যাচের নয়; এটি ইতিহাসের।
গ্যালারিতে বসে থাকা বৃদ্ধ মানুষটি কাঁদছেন। দূরের কোনো গ্রামের ছোট্ট শিশুটি টিভির সামনে হাত জোড় করে প্রার্থনা করছে। একজন বাবা নিজের ছেলেকে বলছে— ‘ভালো করে দ্যাখ… এমন শিল্পী পৃথিবীতে বারবার আসে না।’ তারপর মাঠে ফুটবলটা গড়াল। আর গোটা বিশ্ব আবার বিশ্বাস করতে শুরু করল অলৌকিকতায়। কারণ মাঠে তখন শুধু নিছক একজন ফুটবলার নামেননি। নেমেছেন এক স্বপ্ন, এক যুগ, এক আবেগ। এমন একজন ফুটবলার, যিনি কোটি কোটি ভাঙা হৃদয়কে আশা করতে শিখিয়েছেন। যিনি প্রমাণ করেছেন, শারীরিক প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে কীভাবে সাফল্যের শৃঙ্গে উঠতে হয়।
এ যেন সিনেমার সেই চরিত্র, যার উপর শুরুতে কেউ বিশ্বাস রাখেনি। যে অপমান পেয়েছে, ব্যর্থ হয়েছে, অসুস্থতার সঙ্গে লড়েছে, তবুও হার মানেনি। যে নিজের কান্নাকে লুকিয়ে রেখেছে হাসির আড়ালে, আর নিজের যন্ত্রণাকে বদলে ফেলেছে জাদুতে। আর সেই মানুষটার নাম— লিওনেল মেসি।
ফুটবলের সোনালি ইতিহাসে অনেক মহান খেলোয়াড় বিরাজ করেছেন।
কেউ গোল করেছেন, কেউ ট্রফি জিতেছেন, কেউ দর্শকদের বিনোদন দিয়েছেন। কিন্তু খুব কম ফুটবলারই আছেন, যারা খেলাটাকে ছাড়িয়ে মানুষের আবেগ হয়ে উঠতে পেরেছেন। মেসি সেই বিরল মানুষদের একজন। তিনি শুধু আর্জেন্টিনার আইকন নন। তিনি শুধু এফসি বার্সেলোনার চোখের মণি নন। তিনি গোটা বিশ্বের অন্যতম সেরা একজন অনুপ্রেরণা।
রোসারিও থেকে বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ সিংহাসনে রাজত্ব করার সফরটা মোটেই সহজ ছিল না। দিদা সেলিয়া অলিভেইরা কুচিত্তিনির হাত ধরেই চার বছর বয়সে প্রথম ফুটবল ট্রেনিং শুরু করে ছোট্ট মেসি। স্থানীয় ক্লাব আবানডেরাডো গ্রান্ডোলিতে ফুটবলে হাতেখড়ি ছোট্ট সেই কিশোরের। বাবা জোর্জে তখন সেই দলের কোচ ছিলেন। উচ্চতা কম হলেও বিপক্ষের লম্বা লম্বা ফুটবলারদের অনায়াসেই ড্রিবল করত মেসি। বলটা যেন তার পায়ে আঠার মতো লেগে থাকত।
ছ’বছর বয়সে নিওয়েলস ওল্ড বয়েজে যোগ দেয় আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। নিওয়েলসের জার্সিতে ছোট্ট মেসি হয়ে উঠেছিল গোলমেশিন। কিন্তু ১০ বছর বয়সে তার জীবনে এলো দুর্যোগের কালো মেঘ। বয়স বাড়লেও উচ্চতা কেন বাড়ছে না এই প্রশ্নই সব সময় মেসির মা-বাবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। শেষমেশ ধরা পড়ল মেসির শরীরে গ্রোথ হর্মোন ডেফিসিয়েন্সি রয়েছে। এই রোগের চিকিৎসা করাও কোনো মধ্যবিত্ত সংসারের জন্য খুব বড় একটা চ্যালেঞ্জ ছিল।
প্রতিটা রাতেই মেসি শুধু ভাবত তার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন বোধহয় স্বপ্নই থেকে যাবে। কিন্তু এরইমধ্যে মেসির জীবনে এক টুকরো রোদ্দুর হয়ে উপস্থিত হল স্পেনের হেভিওয়েট ক্লাব এফসি বার্সেলোনা। মেসির পরিবারের কাছে বার্সেলোনার প্রস্তাব ছিল খুব সহজ– ‘আপনার ছেলের চিকিৎসার যাবতীয় খরচা আমরা দেব কিন্তু তার মধ্যে মেসিকে বার্সেলোনার অ্যাকাডেমি লা মাসিয়ায় যোগ দিতে হবে।’ ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনা শহরে পা রাখল ভবিষ্যতের মহাতারকা। ব্যস, আর এমনভাবেই শুরু হল ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সোনালি এক অধ্যায়ের।
লা মাসিয়ায় প্রতিটি সকালে, প্রতিটি অনুশীলনে, প্রতিটি ঘামের ফোঁটায় তৈরি হচ্ছিল এক শিল্পী। যে শুধু ফুটবল খেলত না, বরং ফুটবলকে অনুভব করত। বল তার পায়ে থাকলে মনে হতো সময় থেমে গেছে। যেন পৃথিবীর সব শব্দ নিঃশব্দ হয়ে শুধু এক জাদুকরের জাদু দেখছে।
বার্সেলোনা জার্সিতেই তারপর সেই শান্ত স্বভাবের ছেলেটা হয়ে উঠল বিশ্বফুটবলের ‘লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। ‘লিওনার্দো দা ভিঞ্চি যেমন তার শিল্প, কল্পনা ও নিখুঁত সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে সম্মোহিত করেছিলেন, মেসিও ঠিক তেমনই তার পায়ের জাদু দিয়ে ফুটবলকে নিয়ে গিয়েছেন এক অন্য উচ্চতায়। তার খেলা কখনও শুধুই পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি ড্রিবল, প্রতিটি পাস যেন একেকটি শিল্পকর্ম।
তার ড্রিবল যেন নদীর স্রোতের মতো স্বাভাবিক, তার পাস কবিতার মতো কোমল, আর তার গোল মানে বজ্রপাতের মতো নির্মম। তিনি যখন বার্সেলোনার জার্সিতে মাঠে নামতেন, তখন প্রতিপক্ষ শুধু একজন খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে খেলত না; তারা খেলত এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের বিরুদ্ধে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মেসির প্রভাব শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পৃথিবীর প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র শিশুটিও যেমন তাকে ভালোবাসে, তেমনই বিলাসবহুল শহরের কোটিপতিও তাকে দেখে মুগ্ধ হয়। কারণ মেসি মানুষের অহংকার নন, মানুষের স্বপ্ন।
এই বিশ্বে যেখানে আত্মপ্রচার করা মানুষদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে মেসি শিখিয়েছেন নীরবতার শক্তি কত ভয়ংকর হতে পারে। তিনি কখনও নিজের প্রতিভার অত্যধিক প্রচার করেননি। কখনও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গর্ব করেননি। শুধু তার বা পা দিয়ে ফুটবল মাঠে বুঝিয়েছেন কেন তিনিই সর্বকালের অন্যতম সেরা। আর সেই ভাষা বিশ্বের প্রতিটি ফুটবলপ্রেমী বুঝেছেন। বাংলার অলিতে গলিতে, আফ্রিকার ধুলোমাখা রাস্তায়, ইউরোপের আধুনিক স্টেডিয়ামে, লাতিন আমেরিকার উন্মত্ত গ্যালারিতে— সব জায়গায় একটাই নাম উচ্চারিত হয়েছে ভালোবাসা দিয়ে: ‘মেসি… মেসি… মেসি…’।
তিনি এমন একজন ফুটবলার, যিনি ধর্ম, ভাষা, রাজনীতি, দেশের সীমানা— সবকিছুকে অতিক্রম করেছেন। কারণ তিনি মানুষকে শুধু আনন্দ দেন না, তিনি মানুষকে বিশ্বাস করতে শেখান যে অসম্ভবও সম্ভব। আর তাই যখন আর্জেন্টিনা তাকে দিয়েগো ম্যারাডোনার উত্তরসূরি বলে ডাকতে শুরু করল, তখন সেটি শুধু ফুটবলীয় তুলনা ছিল না।
সেটা ছিল একটি জাতির হৃদয়ের উত্তরাধিকার। ম্যারাডোনা ছিলেন আগুনের বিস্ফোরণ, বিদ্রোহের প্রতীক। আর মেসি? তিনি এক শান্ত সমুদ্র, যার গভীরতা বুঝতে সময় লাগে। ক্লাবের জার্সিতে প্রতিটা ট্রফি জিতলেও দেশের জার্সিতে সর্বস্ব দিয়েও বারবার মেসি হতেন সর্বহারা। তাই তো অনেক বছর ধরে সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হয়ে মেসিকে শুনতে হয়েছে—
‘দেশের হয়ে কী জিতেছে?’
‘এত বড় প্লেয়ার কিন্তু বিশ্বকাপ কোথায়?’
‘ম্যারাডোনার মতো হতে পারবে না।’
২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির বিরুদ্ধে হারের পর মেসির মুখের সেই নীরব কষ্ট আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিষণ্ন দৃশ্যগুলোর একটি। তারপর একের পর এক কোপা আমেরিকা ফাইনাল হার। সমালোচনা, অপমান, হতাশা—সব মিলিয়ে মেসি যেন ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছিলেন। কোপা আমেরিকা সেন্টেনারিওর ফাইনালের পর মেসি আবার জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। কিন্তু কিংবদন্তিরা পালিয়ে যান না। তারা ফিরে আসেন। জাতীয় দলে মেসির প্রত্যাবর্তনও ছিল রাজার মতোই। ২০২১ কোপা আমেরিকা জয়ের রাতে তাই মেসির কান্না ছিল বহু বছরের জমে থাকা যন্ত্রণার বিস্ফোরণ। আর তারপর এলো অমর হয়ে থাকা ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ।
২০২২ বিশ্বকাপ নিছকই একটি টুর্নামেন্ট ছিল না; সেটা ছিল এক শিল্পীর আত্মমুক্তির মহাকাব্য। প্রতিটি ম্যাচে মনে হচ্ছিল যেন ঈশ্বর নিজেই তার শেষ অপূর্ণতাকে পূর্ণ করতে নেমেছেন। ফাইনালে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সেই হাড্ডাহাড্ডি যুদ্ধ ছিল দুই প্রজন্মের সংঘর্ষ। আর স্কোর ৩-৩ হওয়ার পর টাইব্রেকারে জিতে যখন মেসি বিশ্বকাপ ট্রফিটা হাতে তুললেন, তখন শুধু আর্জেন্টিনা নয়, গোটা বিশ্ব আনন্দে কেঁদেছিল। কারণ মানুষ বুঝেছিল—
এটি শুধু একটি ট্রফির জয় নয়।
এটি ধৈর্যের জয়।
এটি নীরব সংগ্রামের জয়।
এটি সেই ছোট্ট অসুস্থ শিশুটির জয়, যাকে একদিন সবাই অবহেলা করেছিল।
আজ তিনি শুধু ফুটবলার নন।
তিনি এক সংস্কৃতি।
তিনি এক আবেগ।
তিনি এমন এক নাম, যাকে ঘিরে প্রজন্ম তৈরি হয়।
আর এখন গোটা বিশ্ব অপেক্ষা করছে সম্ভবত মেসির শেষ বিশ্বকাপের জন্য। শেষবারের মতোই হয়তো আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সি গায়ে চাপিয়ে তিনি আবার মাঠে নামবেন কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন সঙ্গে করে নিয়ে। স্টেডিয়ামের প্রতিটি চিৎকার, প্রতিটি পতাকা, প্রতিটি অশ্রু আবার যেন একটাই কথা বলবে— ‘শেষ বারের মতো তোমার জাদু দেখাও, লিও…’
ফুটবলপ্রেমীরা আবারও হয়তো নীরব প্রার্থনায় মগ্ন যে শেষ বিশ্বকাপেও মেসির হাতে ঐতিহাসিক সেই ট্রফিটা আবার উঠুক। হয়তো তিনি আর আগের মতো দ্রুত দৌড়তে পারবেন না। হয়তো শরীর আগের মতো সাড়া দেবে না। কিন্তু শেষ বিশ্বকাপে মেসি আরেকবার পৃথিবীকে শেখাবেন— ফুটবল শুধু জয়-পরাজয়ের খেলা নয়।
ফুটবল হলো অনুভূতির ভাষা। আর সেই ভাষার সবচেয়ে সুন্দর কবির নাম— ‘মেসি....মেসি....মেসি।’ যেদিন তিনি সত্যিই বিদায় নেবেন, সেদিন হয়তো স্টেডিয়ামের আলো জ্বলবে, দর্শকরা করতালি দেবেন, ট্রফিগুলো জাদুঘরে থাকবে। কিন্তু গোটা বিশ্বে অদ্ভুত এক শূন্যতা তৈরি হবে। কারণ তখন ফুটবল শুধু একজন খেলোয়াড়কে হারাবে না— ফুটবল হারাবে নিজের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়কে।