Print Date & Time : 27 October 2026 Tuesday 07:32 pm

তিন দেশে বিশ্বকাপ, তিনগুণ ভ্রমণ জটিলত

image

শাওন মশিউর: ফুটবল বিশ্বকাপের সঙ্গে গড়ে উঠেছে ভ্রমণ অর্থনীতির সখ্য! প্রথমবারের মতো ৪৮ দেশের অংশগ্রহণের বিশ্বকাপ আয়োজনে থাকছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। তিন দেশের বিস্তৃত ভৌগোলিক পরিসর মিলিয়ে এটি হতে যাচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ‘স্পোর্টস ট্যুরিজম ইভেন্ট’।

যুক্তরাষ্ট্রে স্ট্যাচু অব লিবার্টি, কানাডায় প্রাকৃতিক বিস্ময় নায়াগ্রা, মায়া সভ্যতার প্রাচীন নগরী মেক্সিকো মেটাতে পারে ভ্রমণ প্রিয়দের পিপাসা। তবে তিন দেশের ভিন্ন ভিন্ন সৌন্দর্য উপভোগে রয়েছে প্রতিবন্ধকতাও। যেখানে খরচ, ভিসা জটিলতা, টিকিটের অপ্রতিরোধ্য চাহিদা রূপ নিয়েছে মুখ্য সমস্যা হিসেবে। 

তিন দেশের বিশ্বকাপ: এক টিকিট, তিনটি পৃথিবী

৪৮ দেশ আর ১০৪ ম্যাচের এবারের বিশ্বকাপ ছাড়িয়ে যাবে অতীতের সব কিছুকে। অর্থ উপার্জনে ফিফা ছাড়িয়ে যাবে নিজেদের আর দর্শকদের হবে তিনটি আলাদা সংস্কৃতি, তিনটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং তিন ধরনের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।

বিশ্বকাপে থাকবে যুক্তরাষ্ট্রে আধুনিক স্টেডিয়াম, উচ্চ খরচ এবং উন্নত অবকাঠামো। কানাডায় অপেক্ষাকৃত শৃঙ্খলিত কিন্তু সীমিত ম্যাচ ভেন্যু। আর মেক্সিকোয় থাকবে ফুটবলের সবচেয়ে আবেগঘন লাতিন আমেরিকান পরিবেশ। যদিও এই বৈচিত্র্য দর্শকদের জন্য যেমন আকর্ষণীয় তেমনি জটিলও।

বিশ্বকাপ ২০২৬ ঘিরে সবচেয়ে বড় আলোচনাগুলোর একটি এখন বিমান ভাড়া, টিকিট ও সামগ্রিক ভ্রমণ খরচ। বিদেশি গণমাধ্যমগুলোয় এ নিয়ে ইতোমধ্যেই বিস্তর বিশ্লেষণ, সমালোচনা ও সতর্কতা প্রকাশ হয়েছে। আবার কিছু বিশ্লেষক এটিকে বিশ্বকাপ অর্থনীতির স্বাভাবিক বাস্তবতা বলেও ব্যাখ্যা করছেন।

বিমান ভাড়া: সবচেয়ে বড় ধাক্কার জায়গা

তিন দেশে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ায় দর্শকদের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটও একাধিকবার ব্যবহার করতে হতে পারে। যার কারণে বেশিরভাগ দর্শকের জন্য চিন্তার জায়গা হতে পারে বিমান ভাড়া।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপের সময় ডায়নামিক প্রাইজিং সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলবে এবারের বিশ্বকাপে। অর্থাৎ চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এয়ারলাইনসগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিকিটের দাম বাড়াবে।

চলতি বছর বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে ফুয়েলের দামও বেড়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু মার্চ মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারলাইনসগুলোর জ্বালানি ব্যয় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিমান ভাড়ায়।

বিশ্বকাপ এখন মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে

চাকচিক্য ও সৌন্দর্য উপভোগের বাড়তি খরচ রয়েছে সেটাই প্রমাণ করতে যাচ্ছে এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ। আইটিভি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফাইনালের কিছু টিকিটের দাম ৮ হাজার পাউন্ড (প্রায় ১৪ লাখ টাকা) ছাড়িয়ে গেছে। ফলে প্রশ্ন থাকছে বিশ্বকাপ কি ধীরে ধীরে ধনীদের ইভেন্টে পরিণত হচ্ছে।

নিউইয়র্ক পোস্টের এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বিশ্বকাপ টিকিটের মূল্য নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু ম্যাচের টিকিট ১ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে আর ফাইনালের গড় টিকিট মূল্য প্রায় ১৩ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো জানিয়েছেন, ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য ইতোমধ্যে ৫০০ মিলিয়নের বেশি টিকিট আবেদন জমা পড়েছে। এই বিশাল চাহিদার কারণেই ফিফা প্রথমবার বড় পরিসরে ‘ডায়নামিক প্রাইজিং’ ব্যবহার করছে। অর্থাৎ একটি ম্যাচের টিকিটের দাম মুহূর্তেই বেড়ে যেতে পারে। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের কিছু আইনপ্রণেতা ফিফার টিকিট নীতিকে বৈষম্যমূলক বলে সমালোচনা করেছে।

হোটেল ও আবাসন: আরেক বড় সংকট

বিশ্বকাপ শহরগুলোয় হোটেলের দাম সাধারণ সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস বা মেক্সিকো সিটির মতো শহরে ম্যাচের সময় হোটেল বুকিং পাওয়া শুধু কঠিনই নয়, অনেক সময় অগ্রিম বুকিং ছাড়া অসম্ভব হয়ে যায়।

আসন্ন বিশ্বকাপ শুরুর আগে বিমান ও ম্যাচ টিকিট ছাড়াও হোটেল খরচও বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফিফা ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বিশ্বকাপকে সামনে রেখে কিছু শহরের হোটেল ভাড়া ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। এমনকি কিছু হোটেলের এক রাতের ভাড়া ৬ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়। নিউইয়র্ক, মিয়ামির মতো আয়োজক শহরগুলোয় সার্চ ও বুকিং আগ্রহ আগেভাগেই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। তবে স্পোর্টস বিজনেস জার্নালের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফিফার অফিসিয়াল আবাসন প্ল্যাটফর্ম কিছু শহরে ওপেন  মার্কেটের তুলনায় কম দামে রুম দিচ্ছে। বিশেষ করে যেসব শহরে (আটালান্টা, ডালাস, বাসটন) হোটেল সাপ্লাই বেশি সেখানে দাম তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত।

ফিয়ার অব মিসিং আউট অর্থনীতি

রেডডিটসহ অনলাইন কমিউনিটিগুলোয় এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ অর্থনীতি নিয়ে। ফুটবলপ্রেমীদের অভিযোগ ফিফা টিকিট ধাপে ধাপে ছেড়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। যাতে মানুষ দ্রুত ও বেশি দামে কিনতে বাধ্য হয়। আবার অন্য কেউ কেউ মনে করছে, শেষ দিকে গ্রুপ ম্যাচের টিকিট ও হোটেল খরচ কমেও যেতে পারে।

ভিসা জটিলতা:

সবচেয়ে অবহেলিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বাধা আসন্ন ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে আন্তর্জাতিক দর্শকদের জন্য সবচেয়ে বড় অদৃশ্য চ্যালেঞ্জ এখন ভিসা প্রসেসিং। তিনটি দেশে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ায় একজন দর্শককে বেশ কিছু ক্ষেত্রে তিন দেশের আলাদা প্রবেশ নীতির সঙ্গে মানিয়ে চলতে হবে।

ফিফা নিজেই আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, বিশ্বকাপের টিকিট থাকলেই ভিসা নিশ্চিত হবে না। সংস্থাটি সমর্থকদের আগেভাগে আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছে।

সবচেয়ে বড় চাপ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রক্রিয়া ঘিরে। সাক্ষাৎকার, নিরাপত্তা যাচাই এবং দীর্ঘ প্রসেসিং টাইম নিয়ে ইতোমধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন আতিথেয়তা খাতের সংগঠনগুলোর এক জরিপে দেখা গেছে, আয়োজক শহরগুলোর ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ হোটেল মালিক মনে করছেন কঠোর ভিসানীতি ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক পর্যটকের আগ্রহ কমতে পারে।

বিশেষ করে ভিসা বন্ড পাইলট প্রোগ্রাম নিয়ে সমালোচনা বেড়েছে। কিছু দেশের আবেদনকারীদের জন্য ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত নিরাপত্তা বন্ডের বিষয়টি আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ফিফা এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকার যৌথভাবে ‘ফিফা পাস’ নামে একটি অগ্রাধিকারভিত্তিক অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেম চালু করেছে, যাতে বিশ্বকাপ দর্শকরা দ্রুত ভিসা সাক্ষাৎকারের সুযোগ পান।

কানাডাও আলাদা করে বিশ্বকাপ দর্শকদের জন্য নির্দেশনা প্রকাশ করেছে। দেশটির সরকার জানিয়েছে, বিশ্বকাপের জন্য কোনো বিশেষ ভিসা না থাকলেও আগেভাগে আবেদন করলে ঝুঁকি কমবে। একইসঙ্গে ইটিএ ও ভিজিটর ভিসা প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত গাইডলাইন প্রকাশ করেছে তারা।

বিশ্বকাপের আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও কঠোর করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ লাখের বেশি ভিসা আবেদন উন্নত যাচাই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এদিকে রাজনৈতিক টানাপড়েনও আলোচনায় এসেছে। ইরানের ফুটবল কর্মকর্তাদের ভিসা নিয়ে উদ্বেগ, ফিলিস্তিন ফুটবল ফেডারেশনের কয়েকজন কর্মকর্তার কানাডায় প্রবেশ জটিলতা এসব ঘটনাও বিশ্বকাপের আগে আন্তর্জাতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

অনলাইন কমিউনিটিগুলোয়ও সাধারণ সমর্থকদের উদ্বেগ বাড়ছে। রেডডিটে অনেক ব্যবহারকারী অভিযোগ করেছেন, ফিফা পাস থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাননি বা দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়ার মুখে পড়েছেন।

বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি

২০২৬ সাল থেকে ফুটবল বিশ্বকাপ পূর্ণাঙ্গ ‘স্পোর্টস ট্যুরিজম ইকোনমিতে’ রূপ নিচ্ছে। বিদেশি গণমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ভ্রমণ, হোটেল, বিমান, খাবার, মার্চেন্ডাইজ এবং ডিজিটাল সেবার বিশাল বাজার তৈরি হচ্ছে।

বিশ্ব ভ্রমণ সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী বড় ক্রীড়া আসরগুলো এখন লম্বা সময়ের জন্য ব্র্যান্ডিংয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। অর্থাৎ একটি দেশ বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে নিজের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও পর্যটনকেও বৈশ্বিকভাবে প্রচার করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপ এখন ‘এক্সপেরিয়েন্স ইকোনমি’র অংশ হয়ে গেছে। অর্থাৎ মানুষ শুধু ম্যাচ দেখতে টাকা খরচ করছে না বরং জীবনে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য বিনিয়োগ করছে।

পরিবেশগত বিতর্ক: তিন দেশের বিশ্বকাপ কতটা টেকসই

তিন দেশে ১০৪ ম্যাচ আয়োজনের ফলে পরিবেশগত প্রশ্নও সামনে আসছে। বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমান ভ্রমণের কারণে বাড়বে কার্বন নিঃসরণ। বিশেষ করে ইউরোপীয় গণমাধ্যমগুলোয় ইতোমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে এত বড় ভৌগোলিক পরিসরে বিশ্বকাপ আয়োজন কতটা পরিবেশবান্ধব। ফলে ফুটবলের পাশাপাশি ‘সাসটেইনেবল স্পোর্টস ট্যুরিজম’ এখন নতুন এক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে।

নিরাপত্তা বাস্তবতা: উৎসবের সঙ্গে বাড়ছে সতর্কতাও

বিশ্বকাপ মানেই কয়েক মিলিয়ন মানুষের সমাগম। ফলে নিরাপত্তা এখন আয়োজকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, বড় শহরগুলোর নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং মেক্সিকোর কিছু অঞ্চলের নিরাপত্তা উদ্বেগ নিয়েও আলোচনা রয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। স্টেডিয়াম নিরাপত্তা, সাইবার নজরদারি ও উন্নত স্ক্যানিং প্রযুক্তির মাধ্যমে আয়োজক দেশগুলো এবার হাই-সিকিউরিটি বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বাংলাদেশি দর্শকদের বাস্তবতা

বাংলাদেশি ফুটবলপ্রেমীদের জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে দীর্ঘ ভ্রমণ, ডলার সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়া। ঢাকা থেকে উত্তর আমেরিকায় যাতায়াতে দীর্ঘ ট্রানজিট ও উচ্চ বিমান ভাড়া অনেক দর্শকের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে আগেভাগে পরিকল্পনা, ভিসা প্রস্তুতি এবং বাজেট ব্যবস্থাপনাই হতে পারে বিশ্বকাপ ভ্রমণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।