Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 08:03 pm

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রাষ্ট্র পরিচালনায় বাজেট-ব্যবস্থা ছিল কি?

image

বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশসহ প্রায় প্রতিটি দেশই আগামী এক বছরের সম্ভাব্য আয়-ব্যয় এবং সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার খসড়া হিসেবে বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে বা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রাষ্ট্র পরিচালনায় এমন কোনো বাজেট-ব্যবস্থা ছিল কি না? কোরআন ও সুন্নাহর গভীর বিশ্লেষণে এর একটি চমৎকার ও ভারসাম্যপূর্ণ রূপরেখা পাওয়া যায়।

আধুনিক যুগের মতো এক বছরের লিখিত আয়-ব্যয়ের পূর্বপরিকল্পনা বা আনুষ্ঠানিক ‘বার্ষিক বাজেট’ নবিজি (সা.)-এর পবিত্র যুগে ছিল না। তখন কোনো স্থায়ী রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা উদ্বৃত্ত তহবিল ধরে রাখার প্রচলন ছিল না। জাকাত, গনিমত কিংবা অন্যান্য রাজস্ব আসার সাথে সাথেই তা অভাবী ও হকদারদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হতো। যেমন—বাহরাইন থেকে আসা তৎকালীন ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাজস্ব (প্রায় ৮ লাখ দিরহাম) নবিজি (সা.) এক বৈঠকেই সম্পূর্ণ বিতরণ করেছিলেন (বুখারি: ২২৯৬)। সম্পদ জমিয়ে না রাখার নীতি এবং জনগণের তাৎক্ষণিক অভাব দূর করাই ছিল এর মূল কারণ।

তবে লিখিত বাজেট না থাকলেও, একটি আধুনিক ও কল্যাণমুখী বাজেটের প্রতিটি মৌলিক উপাদান—যেমন আয়ের উৎস, ব্যয়ের খাত, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, জবাবদিহি এবং অপচয়রোধের বিধান ইসলামি অর্থব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গভাবে বিদ্যমান।

আধুনিক বাজেটের মতো ইসলামি রাষ্ট্রেও রাজস্বের প্রধান উৎসগুলো পবিত্র কোরআন দ্বারা সুনির্দিষ্ট:

জাকাত ও সাদাকাহ: যা রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রধান অর্থনৈতিক স্তম্ভ (সুরা তাওবা: ১০৩)।

খুমুস ও ফাই: যুদ্ধলব্ধ এবং বিনাযুদ্ধে অর্জিত সম্পদের রাষ্ট্রীয় অংশ (সুরা আনফাল: ৪১, সুরা হাশর: ৭)।

জিজিয়া: অমুসলিম নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তার বিনিময়ে গৃহীত করা (সুরা তাওবা: ২৯)।

একইভাবে, সংগৃহীত অর্থ কোথায় ব্যয় হবে তাও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। সুরা তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা জাকাত বণ্টনের জন্য আটটি খাত নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এটিই মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম ও সুনির্দিষ্ট ‘ব্যয় বরাদ্দ তালিকা’। খাতগুলো আগে থেকেই নির্ধারিত থাকায় এখানে একক কোনো ব্যক্তির ইচ্ছামতো সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ নেই।

বাজেটের অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। এ প্রসঙ্গে দুটি অনন্য দৃষ্টান্ত রয়েছে:

১. নবিজি (সা.)-এর পারিবারিক মডেল: উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবিজি (সা.) বনু নাজির থেকে প্রাপ্ত খেজুর বিক্রি করে নিজ পরিবারের জন্য পুরো এক বছরের খোরাক অগ্রিম সংরক্ষণ করতেন (বুখারি: ৫৩৫৭)।

২. ইউসুফ (আ.)-এর রাষ্ট্রীয় মডেল: পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ইউসুফ (আ.)-এর সেই বিখ্যাত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, যেখানে তিনি সাত বছরের উদ্বৃত্ত ফসল শীষসহ মজুত করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা পরবর্তী সাত বছরের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ থেকে রাষ্ট্রকে বাঁচিয়েছিল (সুরা ইউসুফ: ৪৭-৪৯)।

ইসলামি অর্থব্যবস্থায় সরকারি অর্থের শতভাগ স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষার (Audit) ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নবিজি (সা.) যখন ইবনুল লুতবিয়্যাহ নামক এক কর্মকর্তাকে জাকাত আদায়ের দায়িত্ব দেন এবং তিনি এসে কিছু সম্পদকে ‘উপহার’ দাবি করেন, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে তাঁর হিসাব নেন এবং সরকারি সম্পদে অনিয়মের ব্যাপারে সতর্ক করেন (বুখারি: ৬৯৭৯)। এছাড়া, আর্থিক লেনদেন লিখে রাখার ব্যাপারে কোরআনের দীর্ঘতম আয়াতে (সুরা বাকারা: ২৮২) সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যা আধুনিক হিসাববিজ্ঞানের মূল ভিত্তি।

ব্যয়ের ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআন কৃপণতা ও অপব্যয় উভয়কেই নিষিদ্ধ করে মাঝামাঝি পথ বা ভারসাম্য বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে। (সুরা ফুরকান)

নবিজি (সা.)-এর এই অর্থনৈতিক নীতিমালা খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। খলিফা উমর (রা.) সর্বপ্রথম ‘দিওয়ান’ বা রাষ্ট্রীয় দপ্তর ও রেজিস্টার খাতা চালু করেন, যার মাধ্যমে নাগরিকদের নিয়মিত ভাতা ও কল্যাণমূলক বাজেট বণ্টন করা হতো।

পরিশেষে বলা যায়, আধুনিক কাঠামোর বাজেট তখন না থাকলেও এর মূল চেতনা—দরিদ্রদের অগ্রাধিকার, অপচয়রোধ এবং নিখুঁত জবাবদিহিতা কোরআন ও সুন্নাহতে সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। আজকের অর্থনীতিতে এই নীতিগুলো বাস্তবায়ন করা গেলেই একটি প্রকৃত কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন সম্ভব।

জা. অর্থনীতি/ উমার