Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 05:45 am

আমির খসরুর অভিষেক: ৫৫ বছরে বাংলাদেশের বাজেটের বিবর্তন

image

ঢাকা: বাংলাদেশের বাজেট ঘোষণার দীর্ঘ ৫ দশকের ইতিহাসে অনেক ব্যক্তি অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৫৫তম বাজেট উপস্থাপনের মাধ্যমে দেশের ইতিহাসে ১৫তম ব্যক্তি হিসেবে নিজের নাম লেখাতে যাচ্ছেন বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 

বাংলাদেশের প্রথম বাজেট দেওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। ১৯৭২ সালে তিনি ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসের প্রথম বাজেট পেশ করেন, যার আকার ছিল মাত্র ৭১৯ কোটি টাকা। তাজউদ্দীন আহমদ কেবল প্রথম বাজেটই দেননি, বরং তিনি দেশের প্রথম তিনটি বাজেট পেশ করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে উল্লেখ্য যে, এরও আগে ১৯৭১ সালের ১৯ জুলাই মুজিবনগর সরকার একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট পেশ করেছিল।

বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট বাজেট উপস্থাপনের সংখ্যার বিচারে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং এম সাইফুর রহমান। তারা দুজনেই বিভিন্ন মেয়াদে সর্বোচ্চ ১২টি করে বাজেট উপস্থাপন করেছেন। আবদুল মুহিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে টানা ১০টি বাজেট পেশ করে এক অনন্য রেকর্ড গড়েছিলেন, এ ছাড়াও তিনি এরশাদ সরকারের সময়ে দুটি বাজেট পেশ করেছিলেন। একইভাবে এম সাইফুর রহমানও বিভিন্ন মেয়াদে ১২টি বাজেট পেশ করে দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন।

বাজেট উপস্থাপনের ইতিহাসে আরও বেশ কয়েকজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি রয়েছেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া টানা ছয়টি বাজেট পেশ করেছিলেন। তার পরে আ হ ম মুস্তফা কামাল টানা পাঁচটি বাজেট উপস্থাপন করেন। এছাড়া অর্থ উপদেষ্টা এম সাইদুজ্জামান (৪টি), মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মুনিম (২টি), এবং অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম (২টি) বাজেট পেশ করেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাজেট পেশ করেছেন।

বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ছাপ পড়েছে। অর্থমন্ত্রী ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপতি, উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং উপদেষ্টারা বাজেট পেশ করেছেন। যেমন ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি ও অর্থমন্ত্রী হিসেবে জিয়াউর রহমান তিনটি বাজেট ঘোষণা করেছিলেন। এছাড়া ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে ড. ওয়াহিদুল হক এবং ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে ড. আজিজুর রহমান মল্লিক বাজেট পেশ করেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের পেশ করা বাজেটটি ছিল ইতিহাসের এক অনন্য ঘটনা, কারণ সেটি ছিল আগের বছরের তুলনায় ছোট আকারের প্রথম বাজেট।

স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের বাজেটের আকার অবিশ্বাস্য গতিতে বেড়েছে। ১৯৭২-৭৩ সালের ৭১৯ কোটি টাকার বাজেট থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশের বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১,৩০৩ গুণ। ১৯৭৯-৮০ অর্থবছরে বাজেটের আকার প্রথম ৩ হাজার কোটির ঘর অতিক্রম করে এবং ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে এটি ৩০ হাজার কোটির মাইলফলক ছোঁয়। ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো বাজেটের আকার ১ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছিল।

আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন)  স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে বাজেট পেশ করবেন, তার মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ’। এই বাজেটের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণের পরিকল্পনা করেছে।

সব মিলিয়ে, স্বাধীনতার সময়কার সীমিত ৪ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার অর্থনীতি আজ ট্রিলিয়ন ডলারের অভিযাত্রায় শামিল হয়েছে, যা এই ৫৫টি বাজেটের পথপরিক্রমারই সফল প্রতিফলন।

—জা. অর্থনীতি/এআইই