শাওন মশিউর: ফুটবল বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়নদের নাম শুধু একটি তালিকা নয়। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আবেগের ইতিহাস। এই চ্যাম্পিয়নদের ইতিহাস মূলত জয়-পরাজয়ের সীমানা পেরিয়ে মানুষের আশা আর হতাশার দীর্ঘ এক যাত্রা।
প্রতিটি অর্জনের পাশে লুকিয়ে আছে হাজারও না বলা গল্প, পুরো জাতির দীর্ঘ অপেক্ষা, ভেঙে পড়া স্বপ্ন আবার কোন তরুণের একক জাদুতে ইতিহাস বদলে যাওয়ার মুহূর্ত। তাই তিন যুগ পর মেসি যখন বিশ্বকাপ ট্রফিতে চুমু আঁকে তখন তার ভার বহন করে পুরো আর্জেন্টাইন জাতি।
ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালকে বলা যেতে পারে মানব আবেগের সবচেয়ে বড় দলিল। যেখানে প্রতিটি শিরোপার পেছনে লেখা থাকে অমরত্ব আর অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের গল্প।
আগামী ১১ জুন পর্দা উঠবে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসরের। এই লড়াই শুরুর আগে এখন পর্যন্ত সর্বাধিক পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, জার্মানি ও ইতালি চারবার করে, আর্জেন্টিনা তিনবার আর ফ্রান্স ও উরুগুয়ে দুবার এবং ইংল্যান্ড ও স্পেন ট্রফি জিতেছে একবার করে।
ব্রাজিল: ফুটবলের সৌন্দর্যের সাম্রাজ্য এবং ১৯৫০-এর কান্না
ফুটবল বিশ্বকাপের ষষ্ঠ আসরে এসে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। এরপর ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৮ ও ২০০২ সালে শিরোপা নিজেদের করে নেয় দলটি। তবে বলা হয়ে থাকে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় গল্প জয়ে নয় বরং পরাজয়ে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০ সালে নিজ দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিষয়ে শতভাগ আশাবাদী ছিল ব্রাজিল। তবে উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-১ গোলের সেই হারকে দেশটির জাতীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ড্র করলেই শিরোপা জয় নিশ্চিত এমন ম্যাচ হারের পর ব্রাজিলিয়ান স্পোর্টস ফেডারেশন তাদের সাদা জার্সিকে ‘অদেশপ্রেমিক’ হিসেবে বিবেচনা করে। এরপরই তারা বেছে নেয় সোনালি-হলুদ ও সবুজ রঙের জার্সি।
ফুটবল বিশ্বকাপে ব্রাজিলে প্রথম শিরোপা আসে কিংবদন্তি পেলের হাত ধরে। পেলের হাত ধরেই নিজেদের প্রথম তিনটি বিশ্বকাপ জিতে হাজারও ফুটবলার জন্ম দেওয়া এই দেশ। প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পর পেলের ডাকনাম দেওয়া হয় দ্য কিং।
১৯৭০ সালে ব্রাজিল ফুটবলকে কেবল খেলায় সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্প বা নান্দনিকতায় পরিণত করেছিল। ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপে ভরাডুবির পর ব্রাজিল দল শৃঙ্খলা, ট্যাকটিক্স এবং শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে তাদের সহজাত নান্দনিক খেলার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে জার্মানির কাছে ১-৭ হারের পর আবার সেই পুরোনো ট্রমা ফিরে আসে। ফুটবল ইতিহাসে ব্রাজিলকে তুলনা করা যেতে পারে দোলনার সঙ্গে। যেখানে সর্বোচ্চ আনন্দ ও সর্বনিম্ন অপমানের মাঝে দোল খাচ্ছে।
জার্মানি: শৃঙ্খলার সাম্রাজ্য, যা কখনও ভেঙে পড়ে আবার উঠে দাঁড়ায়
ফুটবল সংস্কৃতির বিবেচনায় জার্মানিকে সুশৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। ফুটবল বিশ্বকাপে চারবার শিরোপা জয়ের পেছনে রয়েছে দেশটির রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ছাপ।
১৯৫৪ সালে ফেভারিট হাঙ্গেরিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতে পশ্চিম জার্মানি। যুদ্ধের পর বিধ্বস্ত জার্মানির জন্য এই জয় ছিল আত্মপরিচয় পুনর্গঠনের মুহূর্ত। ফুটবল ইতিহাসে এই জয়কে তাই অঘটন বা অলৌকিক ঘটনা বলেই গণ্য করা হয়।
জার্মানি দ্বিতীয়বার শিরোপা জিতে ১৯৭৪ সালে। সে বছর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির রাজনৈতিক বিভাজনের মাঝেই পশ্চিম জার্মানি আবারও চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৯০ সালে বার্লিন দেওয়াল ভেঙে দেওয়ার ঠিক আগে তৃতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয় দেশটি। সবশেষ ২০১৪ সালে আধুনিক, টেকনিক্যাল এবং নিখুঁত ফুটবলে চতুর্থবার ট্রফি উঁচিয়ে ধরে জার্মানি।
আর্জেন্টিনা ও জার্মানির এই ফাইনাল ম্যাচের গল্প ছিল জার্মান কাঠামো ও দক্ষিণ আমেরিকান আবেগের সংমিশ্রণ।
ইতালি: প্রতিরক্ষা, রাজনীতি এবং দীর্ঘ নীরবতা
ফুটবল বিশ্বকাপের দ্বিতীয় ও তৃতীয় আসরেই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে ইতালি। তবে ঘরের মাঠে ১৯৩৪ সালে ইতালির বিশ্বকাপ জয় নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। বলা হয়ে থাকে ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলে ইতালির জয় ছিল ফ্যাসিবাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের কৌশল।
বেনিতো মুসোলিনির ‘যেকোনো মূল্যে জয়’ নীতির ফসল ধরা হয় ইতালির প্রথম বিশ্বকাপ জয়কে। ১৯৩৮ সালের তৃতীয় আসরে ইতালির পাওয়া শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে রয়েছে ব্যাপক সমালোচনা।
ইতালির অন্য দুই শ্রেষ্ঠত্ব আসে ১৯৮২ ও ২০০৬ সালে। ইতালির এই দুই জয়ও ভিন্ন ইতিহাস বহন করে। ১৯৮০ সালে দলটির অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার পাওলো রসি বিখ্যাত টোটোনেরো ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে তিন বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। পরে সাজা কমিয়ে ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ দলে যুক্ত করা হয় এই স্ট্রাইকারকে। এই ঘটনায় প্রশ্ন ওঠে একজন ম্যাচ-ফিক্সিং কেলেঙ্কারির খেলোয়াড় কীভাবে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে।
১৯৮২ বিশ্বকাপে অবশ্য চমক সৃষ্টি করে ইতালি। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচ ড্র করে গোল ব্যবধানে এগিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে জায়গা পায় দেশটি। সে আসরে অন্যতম ফেভারিট ব্রাজিলকে ৩-২ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে। ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন বিতর্কিত পাওলো রসি।
২০০৬ বিশ্বকাপের আগে ইতালীয় লীগের শীর্ষ দলগুলোর বিপক্ষে ম্যাচ ফিক্সিং ও রেফারি নির্বাচনে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। দেশটির ফুটবলের এমন পরিস্থিতির সময়েও ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে চতুর্থবার শিরোপা জিতে ইতালি।
আর্জেন্টিনা: একক নায়ক নয়, একটি জাতির আবেগ
৩৬ বছরের অসাধ্য সাধন করে লিওনেল মেসির হাত ধরে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে শিরোপা জিতে আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনার তিন বিশ্বকাপ জয়েও রয়েছে ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট।
১৯৭৮ সালে প্রথমবার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ খ্যাতি লাভ করে আর্জেন্টিনা। ঘরের মাঠে আয়োজিত বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। কেননা সামরিক শাসনের সময় ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জয়কে অনেকেই রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হিসেবে দেখেন। যা অতীতে ইতালির সময়েও হয়েছে।
১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার হাত ধরে দ্বিতীয়বার ট্রফি জিতে আর্জেন্টিনা। মেক্সিকোর এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ম্যারাডোনার সাফল্যকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত গোল করে আলোচনার জন্ম দেন ফুটবল কিংবদন্তি। যেটাকে পরবর্তী সময়ে নাম দেওয়া হয় ‘হ্যান্ড অব গড’। ম্যারাডোনার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া থেকে এই নামকরণ করা হয়। যেখানে বলা হয় গোলটি ছিল ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে ও একটু ঈশ্বরের হাত দিয়ে। এছাড়াও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ দিয়ে আর্জেন্টিনার শ্রেষ্ঠত্ব ফিরিয়ে আনেন তিনি।
২০২২ সালে আর্জেন্টিনার তৃতীয় জয়টি ছিল অপেক্ষার, ব্যর্থতার ও মেসির শেষ সুযোগের গল্প হিসেবে। আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ফাইনালের টাইব্রেকারে জয় যেন একটি সিনেমার শেষ দৃশ্য, যেখানে নায়ক তার শেষ অধ্যায়ে পৌঁছে যায়।
ফ্রান্স: অভিবাসন, বহুত্ব এবং আধুনিক ফুটবলের প্রতিচ্ছবি
বিশ্বকাপ ফুটবলে ফ্রান্সের দুই শিরোপা ১৯৯৮ ও ২০১৮ সালে। ফ্রান্সের দুই জয়েই ছিল আধুনিক ফুটবলের প্রতিচ্ছবি।
১৯৯৮ সালে ঘরের মাঠে জিনেদিন জিদানের নেতৃত্বে জয় ছিল জাতিগত বৈচিত্র্যের উদযাপন। সেই চ্যাম্পিয়ন দলকে বলা হয় ব্ল্যাক-ব্লাংক-বুর ফ্রান্স। এখানে আফ্রিকান, ইউরোপিয়ান ও আরাবিয়ান সংমিশ্রণকে বোঝানো হয়।
২০১৮ সালে কিলিয়ান এমবাপ্পের হাত ধরে ফ্রান্সের শ্রেষ্ঠত্ব দেখায় নতুন প্রজন্মের গতি ও শক্তি। পাশাপাশি এটা দেখায় আধুনিক ফুটবল কতটা ডেটা ও অ্যাথলেটিসিজম নির্ভর হয়েছে।
উরুগুয়ে: চ্যাম্পিয়ন যাত্রার প্রথম পথিক
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১৯৩০ ও ১৯৫০ সালে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে উরুগুয়ে। প্রথমবার জয়ে ইতিহাস লেখা শুরু হয়েছিল, দ্বিতীয়বারে ছিল সবচেয়ে বড় অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ের জন্ম দেওয়া ঐতিহাসিক জয়।
১৯৩০ ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম আসরে স্বাগতিক ছিল উরুগুয়ে। আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয় দেশটি। অপরদিকে ১৯৫০ সালে মারাকানায় প্রায় ২ লাখ দর্শকের সামনে ব্রাজিলকে হারিয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় আপসেট সৃষ্টি করে উরুগুয়ে।
ইংল্যান্ড ও স্পেন: একবারের গল্প, কিন্তু চিরস্থায়ী প্রভাব
১৯৬৬ বিশ্বকাপে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ১০১ মিনিটে ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্টের গোল নিয়ে ব্যাপক নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। লাইনসম্যান গোল দিলেও রিপ্লেতে দেখা যায় বল পুরোপুরি গোলপোস্টের ভেতরে ঢোকেনি। এটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বিতর্কগুলোর একটি। শেষ পর্যন্ত ৪-২ ব্যবধানে ম্যাচটি জয় লাভ করে ইতিহাস গড়ে স্বাগতিক ইংল্যান্ড।
২০১০ সালে স্পেনের বিশ্বকাপ জয় মূলত টিকি-টাকা ফুটবলের চূড়ান্ত বিজয়। জটলা তৈরি করে সুযোগ তৈরির প্রচেষ্টায় আসরজুড়ে সফল ছিল স্পেন। ফাইনালে ১১৬ মিনিটের গোলে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয় দেশটি। সে আসরে স্পেন মূলত একটি ফুটবল দর্শন প্রতিষ্ঠা করেছিল।
বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন তালিকা শুধু জয়ীদের গর্ব নয়। এটি মানুষের আবেগ, রাজনীতি, ব্যর্থতা আর পুনর্জন্মের এক দীর্ঘ দলিল। প্রতিটি শিরোপার পাশে যেমন লেখা থাকে আনন্দের গল্প, তেমনি তার নিচেই চাপা পড়ে থাকে ভাঙা স্বপ্নের অসংখ্য স্তর। কারণ শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ আমাদের যা শেখায় তা হলো ট্রফি হাতে ওঠে এক দেশের, কিন্তু সেই ট্রফির জন্য লড়াই করে পুরো পৃথিবী।