Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 03:05 am

গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কারা?

image

বিশ্বকাপ শুধু একটি ট্রফির লড়াই নয়— এটি তারকাদের মহারণ, স্বপ্নের মঞ্চ, ইতিহাস লেখার প্রতিযোগিতা। প্রতি চার বছরে ফুটবল বিশ্ব অপেক্ষা করে এমন কিছু মুহূর্তের জন্য, যখন একজন স্ট্রাইকার পুরো পৃথিবীকে মুগ্ধ করে গোলের পর গোল করে নিজের নাম লিখে দেন অমরত্বের খাতায়। কখনও রোনালদো নাজারিও বিস্ফোরক ফিনিশিং, কখনও মিরোস্লাভ ক্লোসার নিখুঁত পজিশনিং আবার কখনও জেমস রদ্রিগেজের জাদুকরী বাঁ পা— বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট সব সময়ই আলাদা এক আকর্ষণের নাম।

২০২৬ বিশ্বকাপেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। বরং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে বসতে যাওয়া এই আসরে গোল্ডেন বুটের লড়াই হতে পারে ইতিহাসের অন্যতম জমজমাট। কারণ এবার একই মঞ্চে দেখা যাবে একদিকে অভিজ্ঞ কিংবদন্তিদের অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের ভয়ংকর প্রতিভাদের। একদিকে শেষ বিশ্বকাপে নিজের গল্পটাকে আরও মহিমান্বিত করতে চাইবেন লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। অন্যদিকে বিশ্বফুটবলের নতুন রাজত্ব দখলের মিশনে থাকবেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হাল্যান্ড কিংবা লামিনে ইয়ামালরা।  গোল, গতি, নাটকীয়তা আর রেকর্ড ভাঙার প্রত্যাশায় তাই উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে আক্রমণ ভাগের তারকাদের এক মহোৎসব। সেই লড়াইয়ে কারা এগিয়ে আছেন গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড়ে— চলুন দেখে নেওয়া যাক।

১. কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স)

কিলিয়ান এমবাপ্পে হতে পারেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার, যিনি দুবার গোল্ডেন বুট জিতবেন। ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হারের কষ্ট থাকলেও আট গোল করে তিনি জিতেছিলেন গোল্ডেন বুট। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে দুর্দান্ত মৌসুম কাটানোর পর এবার তাকে ঘিরে প্রত্যাশাও আকাশছোঁয়া। ফ্রান্স দলে অনেক তারকা থাকলেও দলের শিরোপা স্বপ্নের মূল চালিকাশক্তি হবেন এমবাপ্পে নিজেই। চলতি মৌসুমে রিয়ালের জার্সিতে ইতোমধ্যে ৪০ গোলের মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছেন তিনি। গোল্ডেন বুটের সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে তাকেই দেখা হচ্ছে।

২. হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড)

২০১৮ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা রেখে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন কেইন। গ্যারি লিনেকারের পর দ্বিতীয় ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে এই কীর্তি গড়েন তিনি। তখন টটেনহাম হটস্পারের হয়ে খেললেও এখন বায়ার্ন মিউনিখের জার্সিতে বুন্দেসলিগায় নিয়মিত গোল করে যাচ্ছেন। এ বছর ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুটও প্রায় নিশ্চিত তার। টমাস টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ড খুব আক্রমণাত্মক ফুটবল না খেললেও গোল খুঁজে নিতে কখনও সমস্যা হয় না কেইনের। চোট ছাড়া তাকে থামানো কঠিন।

৩. লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা)

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, বিশ্বকাপে কখনও গোল্ডেন বুট জেতেননি মেসি। ২০২২ সালে এমবাপ্পের কাছে পিছিয়ে পড়েছিলেন তিনি। তবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার হয়ে এটিই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ আর সেখানেই প্রথমবারের মতো গোল্ডেন বুট জয়ের স্বপ্ন দেখবেন তিনি। লা আলবিসেলেস্তেরা এখনও মেসিকেন্দ্রিক। বয়স বাড়লেও দলের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করছে তার ওপর। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার ১১৬ গোলের সংগ্রহ আরও সমৃদ্ধ হওয়ার অপেক্ষায়। আর চার গোল করলেই তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হতে পারেন— যদি এমবাপ্পে তাকে ছাড়িয়ে যেতে না পারেন। দক্ষিণ আমেরিকার এই জাদুকরের বিপক্ষে বাজি ধরা তাই কঠিন।

৪. লামিনে ইয়ামাল (স্পেন)

এটাই হবে ইয়ামালের প্রথম বিশ্বকাপ। তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চের চাপ সামলাতে তিনি অভ্যস্ত। ইউরো ২০২৪–এ স্পেনের শিরোপাজয়ে দারুণ অবদান রাখেন তিনি। টুর্নামেন্টের সেরা গোল ও সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জেতেন। গোল্ডেন বুট জয়ের মতো পর্যাপ্ত গোল করতে পারবেন কি না সেটি এখনও প্রশ্ন। তবে স্পেনের আক্রমণের মূল ভরসা যে তিনি, তাতে সন্দেহ নেই। বার্সেলোনার হয়েও দুর্দান্ত ছন্দে ছিলেন ইয়ামাল। হ্যামস্ট্রিং চোট কাটিয়ে উঠলে উত্তর আমেরিকার মঞ্চ মাতানোর অপেক্ষায় এই তরুণ তারকা।

৫. আর্লিং হাল্যান্ড (নরওয়ে)

‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে দেখা হচ্ছে নরওয়েকে। আর সেই সম্ভাবনার কেন্দ্রে আছেন হালান্ড। জাতীয় দলের হয়ে ৪৯ ম্যাচে ৫৫ গোল সংখ্যাটা অবিশ্বাস্যই। নরওয়ে প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলেও হালান্ড যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারেন। ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকারের জন্য হ্যাটট্রিক যেন নিত্যদিনের ব্যাপার। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে মৌসুমটা ভালোভাবে শেষ করতে পারলে তার আত্মবিশ্বাস আরও বাড়বে। আর চাপ সামলানো? সেটি তো হালান্ডের জন্য কোনো ব্যাপারই নয়।

৬. ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল)

আন্তর্জাতিক ফুটবলে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে কখনই অবমূল্যায়ন করা যায় না। ৪১ বছর বয়সি এই তারকা এখন আর ইউরোপের সেরা ডিফেন্ডারদের বিপক্ষে নিয়মিত খেলেন না, কারণ তিনি খেলছেন আল নাসরে। তবুও গোল করার ক্ষুধা ও দক্ষতা এখনও অটুট। রবার্তো মার্তিনেজের অধীনে পর্তুগালের আক্রমণের নেতৃত্ব দেবেন রোনালদোই। এটিই হতে যাচ্ছে তার শেষ বিশ্বকাপ।  আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ফ্রি-কিক ও পেনাল্টির সুযোগও পাবেন তিনি। সঙ্গে থাকবেন ব্রুনো ফার্নান্দেজ, ভিতিনহা, বার্নান্দো সিলভাদের মতো সৃজনশীল তারকারা।

৭. ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (ব্রাজিল)

ব্রাজিল দলে রাফিনহার জন্য বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন তারই সতীর্থ ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকাও দারুণ ফর্মে আছেন। তবে জাতীয় দলের হয়ে তার গোলসংখ্যা আশানুরূপ নয়— ৪৭ ম্যাচে মাত্র ৮ গোল। কিন্তু সাবেক রিয়াল কোচ কার্লো আনচেলত্তি তার সেরাটা বের করে আনতে পারেন। ২০২২ বিশ্বকাপে মাত্র এক গোল করা ভিনিসিয়ুস এবার নিজেকে নতুনভাবে প্রমাণ করতে চাইবেন।

৮. রাফিনহা (ব্রাজিল)

গত দুই দশকে ব্রাজিলের প্রভাব কিছুটা কমেছে। তবে কার্লো আনচেলত্তির অধীনে অত্যন্ত প্রতিভাবান দলটি এবার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্য নিয়ে নামছে। সেই মিশনে রাফিনিয়ার ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বার্সেলোনার এই উইঙ্গার ইনজুরির কারণে আগের মৌসুমের মতো বিধ্বংসী না হলেও ধারাবাহিকভাবে অবদান রেখে যাচ্ছেন। তবে সমস্যা হতে পারে ব্রাজিলের সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স। দল যদি দ্রুত বিদায় নেয় তাহলে নিজেকে মেলে ধরার সুযোগও কমে যাবে তার।

৯. উসমান দেম্বেলে (ফ্রান্স)

২০২৪-২৫ মৌসুমে ব্যালন ডি’অর জয়ী অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর এবার কিছুটা ছন্দ হারিয়েছেন দেম্বেলে। তবুও পিএসজির হয়ে নিয়মিত গোল করে যাচ্ছেন তিনি। ফ্রান্সের আক্রমণ ভাগে তারকার ছড়াছড়ি। সেই বহুমাত্রিক আক্রমণের অন্যতম বড় অস্ত্র দেম্বেলে। উইং কিংবা সেন্ট্রাল— দুই জায়গাতেই ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারেন তিনি। ফ্রান্সকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার ধরা হচ্ছে। ফলে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে গোল বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ পাবেন দেম্বেলে।

১০. লাউতারো মার্তিনেজ (আর্জেন্টিনা)

শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নামছে আর্জেন্টিনা। সেই দলের লিওনেল মেসি আলো কাড়লেও দলের জন্য বড় ভূমিকা রাখতে পারেন লাউতারো মার্তিনেজ। ২০২২ বিশ্বকাপে গোলশূন্য ছিলেন তিনি, এমনকি গ্রুপ পর্বেই একাদশে জায়গা হারান। কিন্তু ২০২৪ কোপা আমেরিকায় পাঁচ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এই ইন্টার মিলান স্ট্রাইকার। ফাইনালের জয়সূচক গোলটিও ছিল তার। ইন্টার মিলানের হয়ে দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়ে এবার বিশ্বকাপেও নিজের সেরাটা দেখাতে মুখিয়ে আছেন মার্তিনেজ।