নিজস্ব প্রতিবেদক: আগামী ১১ জুন পেশ হতে যাওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিশুদের সামাজিক সুরক্ষা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট ও বৈপ্লবিক বরাদ্দের জোর দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন।
সোমবার (৮ জুন) গণমাধ্যমকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
সেভ দ্য চিলড্রেনের আহ্বান, শুধুমাত্র বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, বরং সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে। এমন ন্যায়ভিত্তিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে যাতে প্রান্তিক পর্যায়ের শিশুদের কাছেও সব ধরনের সুবিধা পৌঁছায়। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষাখাতে শিশুকেন্দ্রিক বরাদ্দের কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বরাদ্দকৃত অর্থ অব্যবহৃত না থেকে কার্যকর পরিবর্তন আনে। এই প্রত্যাশাগুলো মাঠ পর্যায় থেকে পাওয়া বাস্তব অভিজ্ঞতা ও তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেভ দ্য চিলড্রেনের সহায়তায় পরিচালিত শিশু সংগঠন ‘ন্যাশনাল চিলড্রেনস টাস্ক ফোর্স’ দেশের ২৭টি জেলার শিশুদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা তুলে ধরেছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বন্যার পানিতে মাসের পর মাস শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে, ফলে এই অঞ্চলের শিশুরা সহজেই শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ের ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। সিলেটের চা-বাগানে শিশুদের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার অভাবে প্রতিরোধযোগ্য রোগেও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। উপকূলীয় বরগুনা অঞ্চলের লবণাক্ত পানি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে। ফরিদপুরে হতাশ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের মাঝে সংকট মোকাবিলার উপায় হিসেবে বাড়ছে মাদকের ব্যবহার। সাতক্ষীরায় যেখানে শিশুদের খেলার মাঠ থাকার কথা, সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং’। চুয়াডাঙ্গায় ৭ বছরের শিশুরাও রাস্তায় বেড়ে উঠছে; যারা থাকছে শিক্ষার বাইরে, রাষ্ট্রের নজরের বাইরে।
উপরোক্ত বাস্তবতা শিক্ষায় অর্থায়ন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, শিশুসুরক্ষা, পুষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসে, যা আসন্ন জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।
শিশুদের এই বাস্তব অভিজ্ঞতা ও চাহিদাকে সামনে রেখে সেভ দ্য চিলড্রেন সরকারের কাছে ৬টি গুরুত্বপূর্ণ বাজেট সুপারিশমালা তুলে ধরছে। আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই:
(১) জাতীয় বাজেটে পুনরায় ‘শিশু বাজেট বিবরণী’ প্রকাশ করতে হবে, যাতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে শিশুকেন্দ্রিক বরাদ্দ, ব্যয় ও অগ্রগতি স্পষ্টভাবে এবং স্বচ্ছভাবে উল্লেখ করা থাকে,
(২) শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে মোট জাতীয় বাজেটের ১৬ শতাংশে উন্নীত করতে হবে এবং প্রথম থেকেই নতুন ৫০ হাজার কোটি টাকার পিইডিপি-৫ কার্যক্রমকে শক্তিশালীভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে,
(৩) স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে বাজেটের ১১ শতাংশে উন্নীত করতে হবে, যেখানে শিশু ও মায়েরা হবে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত উপকারভোগী। এর মধ্যে প্রতিটি জেলা হাসপাতালে কার্যকর এনআইসিইউ, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী, টিকাদান ও পুষ্টি কার্যক্রম জোরদার করা, এবং কিশোর-কিশোরী ও কমিউনিটির জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়াশ সেবা সম্প্রসারণ অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে,
(৪) সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও মাদকাসক্তি থেকে শিশুদের সুরক্ষায় সমন্বিত বাজেট বরাদ্দ ও ইউনিয়ন পর্যায়ে শিশু ও নারী সহায়তা সেলের জন্য আলাদা তহবিল নিশ্চিত করতে হবে,
(৫) প্রান্তিক পর্যায়ের প্রতিটি শিশুর জন্য কার্যকর ও চাহিদাভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অভিভাবককে সম্পৃক্ত করতে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বাড়ানো এবং বন্যা, মূল্যস্ফীতি বা অন্যান্য জরুরি সংকট মোকাবেলায় ‘চাইল্ড বেনিফিট কনটিনজেন্সি ফান্ড’ গঠন করতে হবে, এবং
(৬) জলবায়ু সহনশীল স্কুল, শিশু-কেন্দ্রিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা মেয়েদের জন্য পরিবেশবান্ধব দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এই প্রতিটি দাবির পেছনে আছে একেক জন শিশুর বাস্তব অভিজ্ঞতার গল্প, তাদের না পাওয়ার গল্প।
বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, আমরা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে চরাঞ্চল ও চা-বাগানের একটি মেয়েও শহরের অন্য একজন শিশুর মতো সমান সুযোগ পাবে। যে শিশুরা আজ এই বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেছে, তারাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাই আজ শিশুদের জন্য যে বাজেট বিনিয়োগ করা হবে, সেটিই হবে একটি উন্নত, মানবিক ও টেকসই বাংলাদেশ বিনির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।
—জা.অর্থনীতি/এনজে