পশ্চিমা বিশ্বে ‘বাকস্বাধীনতা’ বা মুক্তমতের অধিকারকে গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ মনে করা হয়। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই অধিকারের সংজ্ঞা কি সবার জন্য সমান? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক চরম দ্বিমুখী নীতি? সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাকস্বাধীনতা এখন আর সবার জন্য নিরপেক্ষ কোনো অধিকার নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে ক্ষমতার এক হাতিয়ার।
চলুন দেখে নেওয়া যাক, কীভাবে মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে এই অধিকারের সুর বদলে যায়:
ইউরোপজুড়ে কট্টর ডানপন্থীদের মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য, পবিত্র ধর্মগ্রন্থের অবমাননা কিংবা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে উগ্র প্রচারণাকে প্রায়শই ‘বাকস্বাধীনতা’র দোহাই দিয়ে আড়াল করা হয়। একে বর্ণনা করা হয় ‘গণতান্ত্রিক অধিকার’ বা ‘সাহসী সত্য কথন’ হিসেবে। অথচ, ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় যখন কোনো মুসলিম বা বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকারী নিজের অধিকার কিংবা ফিলিস্তিনের পক্ষে সংহতি জানিয়ে আওয়াজ তোলেন। তখন সেই একই স্বাধীনতাকে রাতারাতি ‘জননিরাপত্তার জন্য হুমকি’ বা ‘উগ্রবাদ’ হিসেবে তকমা দিয়ে দমন করা হয়।
যুক্তরাজ্যসহ অনেক পশ্চিমা দেশেই ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিমবিদ্বেষের সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা নির্ধারণে অনীহা প্রকাশ করা হয়। রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমের একাংশের দাবি, এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দিলে নাকি ‘মুক্তমত প্রকাশ’ বাধাগ্রস্ত হবে! এই সুযোগে মুসলিমদের ধর্মীয় আচার কিংবা পোশাক নিয়ে চরম আপত্তিকর মন্তব্যকেও ‘রম্য’ বা ‘উস্কানিমূলক রসিকতা’ বলে পার পাইয়ে দেওয়া হয়। কোনো মুসলিম জনপ্রতিনিধি বা সাধারণ নাগরিক এর প্রতিবাদ করলে, উল্টো তাদেরকেই বাকস্বাধীনতার শত্রু হিসেবে দাঁড় করানো হয়। এই বৈষম্যমূলক মানসিকতা আজ নতুন নয়; অতীতেও কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার হরণের সময়ও এমন চতুর অজুহাত ব্যবহার করা হয়েছিল।
তথাকথিত এই মুক্তমতের প্রবক্তাদের আসল চেহারা সবচেয়ে বেশি নগ্ন হয়েছে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের ক্ষেত্রে। বিশ্বজুড়ে চলমান সংকটের মাঝে যখনই কোনো মুসলিম শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী বা মানবাধিকার কর্মী ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলছেন, তখনই নেমে আসছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। অনেককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে, হারাতে হচ্ছে চাকরি।
ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি সাক্ষ্য দেয়, বাকস্বাধীনতা আজ আর সবার জন্য সমানাধিকারের প্রতীক নয়। এটি মূলত রূপ নিয়েছে একটি বিশেষ সুবিধায়—যা নির্ধারণ করে কার কণ্ঠস্বরকে সম্মান দেওয়া হবে আর কার পরিচয়কে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক হিসেবে গণ্য করা হবে। পশ্চিমের এই দ্বিমুখী নীতি কেবল মানবাধিকারের মূল চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং বিশ্বজুড়ে তৈরি করছে এক গভীর সামাজিক বিভাজন।
জা. অর্থনীতি/ উমার