Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 05:50 am

খাগড়াছড়িতে লিচুর বাম্পার ফলনেও হতাশ চাষিরা

image

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি: খাগড়াছড়িতে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ লিচুর ফলন হলেও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। অতিরিক্ত উৎপাদন এবং একসঙ্গে বাজারে লিচু ওঠায় জেলার বিভিন্ন হাটে লিচুর দাম আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে দেশি জাতের লিচুর তেমন কোনো ক্রেতাই নেই বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

জেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা বাজারে ভালো মানের ‘চায়না-২’ জাতের লিচু প্রতি পিস মাত্র ১ টাকা এবং ‘চায়না-৩’ জাতের লিচু ৩ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আকারে ছোট ও দেশি লিচুর দাম আরও কম। অন্যদিকে, পাইকারি বাজারে এসব লিচু বিক্রি হচ্ছে প্রায় অর্ধেক দামে। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন বাগান মালিকরা।

লিচু চাষিরা জানান, এ বছর অনুকূল আবহাওয়া থাকায় বাগানে প্রচুর ফলন এসেছে। কিন্তু লিচু পাকার পর বেশিদিন গাছে রাখা যায় না। তাই স্বল্প সময়ের মধ্যে সব লিচু বাজারে চলে আসায় সরবরাহ ব্যাপক বেড়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় ক্রেতা না থাকায় দাম পড়ে গেছে।

জেলা সদরের পাঁচ মাইল এলাকা থেকে বাজারে লিচু নিয়ে আসা হেমন্ত ত্রিপুরা বলেন, "এ বছর লিচুর ভালো ফলন হয়েছে, রং এবং সাইজও সুন্দর। সকালে চায়না-২ জাতের এক ঝাঁকি লিচু এনে খুচরা বিক্রি করছি, কারণ পাইকারিতে কোনো দাম নেই। সকালে প্রতি ১০০ পিস লিচু ১০০ টাকায় বিক্রি করেছি, এখন ৮০ টাকা হলেও বিক্রি করে দেবো।"

হাতির মাথা এলাকা থেকে বাজারে আসা আরেক চাষি ধনবিকাশ ত্রিপুরা বলেন, "আমার ৭০টি লিচু গাছ রয়েছে। আজ ৪ হাজার ৩০০ পিস লিচু বাজারে এনেছিলাম। কিন্তু ১ হাজার লিচু মাত্র ৯০০ টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি।"

একাধিক চাষি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফলন ভালো হলেও দাম না থাকায় লাভ তো দূরের কথা, বাগান পরিচর্যা, শ্রমিক ও পরিবহন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে গেছে।

এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, খাগড়াছড়ি থেকে দেশের অন্যান্য জেলায় লিচু পাঠাতে গেলে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয়। বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠন, বাজার ফান্ড এবং জেলা পরিষদের নামে পথে পথে চাঁদা দিতে হয় বলে অভিযোগ তাদের। অতিরিক্ত খরচের কারণে বাইরের জেলার বড় ব্যবসায়ীরা খাগড়াছড়ি থেকে লিচু কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

পাইকারি ব্যবসায়ী মো. খালিদ বলেন, "গত বছর চায়না-৩ জাতের লিচু প্রতি ১০০ পিস সর্বনিম্ন ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, আর এবার তা মাত্র ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।"

ব্যবসায়ী সোলাইমান অভিযোগ করে বলেন, "খাগড়াছড়ি বাজার থেকে লিচু বাইরে পাঠাতে গেলে নানা খাতে ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ (চাঁদা) দিতে হয়। কার্টন প্রতি বাজার ফান্ড ৪০ টাকা, জেলা পরিষদ ৫০ টাকা এবং চেঙ্গি ব্রিজ এলাকায় ৫০ টাকা করে নেওয়া হয়। এছাড়াও হাতির কবর এলাকায় গাড়িপ্রতি ১,৫০০ টাকা এবং জিরোমাইল পার হতে আরও ১,৫০০ টাকা দিতে হয়। গাড়ির চালান ৪০০ টাকা ছাড়াও মাটিরাঙ্গায় দুই গ্রুপকে দিতে হয় আরও ৪০০ টাকা। এর বাইরেও সড়কের বিভিন্ন স্থানে টাকা ওড়াতে হয়।"

খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, "এ বছর জেলায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়েছে। দেশীয় জাতের পাশাপাশি এখানে চায়না-২ এবং চায়না-৩ জাতের লিচু রয়েছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে বাজারজাতকরণ চলছে এবং এবার জেলায় রেকর্ড ফলন হয়েছে।" তিনি আরও জানান, গত তিন-চার বছর ফলন কম হওয়ায় অনেকেই বাগান কেটে ফেলেছিলেন। তবে লিচু বাগান না কেটে সঠিক পরিচর্যা করলে কৃষকরা দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবেন।

ভুক্তভোগীদের মতে, দ্রুত বাজার ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় করা এবং পরিবহনের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত খরচ ও চাঁদা আদায় বন্ধ করা না গেলে, প্রতি বছরই খাগড়াছড়ির লিচু চাষিদের এমন বড় লোকসানের মুখে পড়তে হবে।

—জা. অর্থনীতি/আরএস