আধুনিক সভ্যতায় আমাদের জীবনযাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। আলো, পাখা, এসি থেকে শুরু করে হাতে থাকা স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের সংযোগ—সবই সচল থাকে বিদ্যুতের কল্যাণে। এমনকি বড় বড় অট্টালিকায় পানির পাম্প, লিফট, হাসপাতালের জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি এবং মসজিদের ইবাদতের পরিবেশও আজ এই শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে। কয়েক ঘণ্টার লোডশেডিং আমাদের স্বাভাবিক জীবনকে স্থবির করে দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহর দেওয়া এই মহামূল্যবান নিয়ামতের কদর কি আমরা করছি?
ইসলাম সব সময় জীবনযাপনে মধ্যপন্থা অবলম্বনের শিক্ষা দেয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, তুমি একেবারে ব্যয়কুণ্ঠ হয়ো না আর একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না, তাহলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, ২৯)
এই আয়াতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা ইমানের দাবি। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে আমাদের দেশেও বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামনে এই সংকট আরও বাড়তে পারে। এমতাবস্থায় আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো বিদ্যুতের অপচয় রোধ করা।
অনেক সময় দেখা যায়, আমরা অপ্রয়োজনে ঘরের বাতি জ্বালিয়ে রাখি বা রুম খালি থাকলেও ফ্যান বন্ধ করি না। বিশেষ করে এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা চূড়ান্ত বিলাসিতার পরিচয় দেই। কনকনে শীত অনুভূত হওয়া সত্ত্বেও এসি চালিয়ে কম্বল গায়ে দেওয়া কিংবা ভারী কোট পরে বসে থাকা স্পষ্ট অপচয়। মনে রাখা প্রয়োজন, অপচয়কারীকে পবিত্র কোরআনে ‘শয়তানের ভাই’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে (সুরা বনি ইসরাঈল, ২৭)।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, শয়তানের ভাই হওয়ার চেয়ে বড় লাঞ্ছনা আর কিছু হতে পারে না। প্রবহমান নদীর তীরে বসেও অজুতে অতিরিক্ত পানি ব্যবহারে যেখানে নিষেধ করা হয়েছে (ইবনে মাজাহ, ৪২৫), সেখানে জাতীয় সম্পদ বিদ্যুতের অপচয় করা কত বড় অপরাধ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি মসজিদ বা বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানেও আমাদের সচেতন হওয়া জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মুসুল্লি বা সাধারণ মানুষ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অপ্রয়োজনে এসি বা ফ্যান চালানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। অথচ মহান আল্লাহ প্রিয় বান্দাদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, আর তারা যখন ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না; বরং মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে।’ (সুরা ফুরকান, ৬৭)
হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, আল্লাহ তিনটি বিষয় অপছন্দ করেন—অহেতুক কথা বলা, অনর্থক প্রশ্ন করা এবং সম্পদ বিনষ্ট করা (সহিহ মুসলিম, ১৭১৫)। বিদ্যুৎ এক প্রকার জাতীয় সম্পদ। এর অপচয় মানেই হলো সামষ্টিক সম্পদের ক্ষতি করা। নিয়ামতের সঠিক মূল্যায়ন না করলে আল্লাহ সেই নিয়ামত ছিনিয়ে নেন বা সংকুচিত করে দেন।
আসুন, আমরা আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করি। প্রয়োজন ছাড়া বাতি, পাখা বা এসি বন্ধ রাখার অভ্যাস গড়ে তুলি। দিনের আলো কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করি। মনে রাখবেন, আপনার সামান্য সচেতনতা দেশের বড় কোনো সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে এবং মহান আল্লাহর কাছে আপনি একজন মিতব্যয়ী বান্দা হিসেবে গণ্য হতে পারেন।
জা. অর্থনীতি/ উমর