আন্তর্জাতিক ডেস্ক:লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে ইসরায়েলি বাহিনীর তীব্র বিমান হামলায় গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৪১ জন নিহত হয়েছেন। দুই সপ্তাহ আগে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির শর্ত বারবার লঙ্ঘন করে এই প্রাণঘাতী অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েল। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবারের নতুন দফা হামলায় দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিহ জেলার শুকিন শহরে ৩ জন এবং কাফার দাজাল গ্রামে একটি গাড়িতে হামলায় ২ জন নিহত হন। এ ছাড়া লওয়াইজাহ গ্রামে একটি বসতবাড়িতে বিমান হামলায় আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লেবাননে এ পর্যন্ত নিহতের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,৬৫৪ জনে এবং আহতের সংখ্যা ৮ হাজার ১৮৩ জন ছাড়িয়েছে। গত ১৭ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এবং মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত বর্ধিত হওয়া যুদ্ধবিরতিটি বর্তমানে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। চীনও বর্তমান পরিস্থিতিকে পূর্ণাঙ্গ ‘যুদ্ধবিরতি’ না বলে ‘নির্ধারিত মাত্রার হামলা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। বাস্তবে দক্ষিণ লেবাননে সংঘাত কমার পরিবর্তে এর পরিধি ও ভয়াবহতা ক্রমাগত বাড়ছে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে।
ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও পিছু হটছে না সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। গোষ্ঠীটি লেবানিজ ভূখণ্ডের ভেতরে অবস্থানরত ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর পালটা হামলা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা ফাইবার-অপটিক ক্যাবল নিয়ন্ত্রিত আধুনিক ড্রোন ব্যবহার করে ইসরায়েলি ট্যাংক ও সামরিক যান লক্ষ্য করে সফল অভিযান চালাচ্ছে। এ ছাড়া বিনত জবেইল এবং হুলা গ্রামে ইসরায়েলি সেনাদের জমায়েত লক্ষ্য করে চালানো গোলন্দাজ হামলায় সম্প্রতি ৩ জন ইসরায়েলি সেনার মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চুক্তিটি পুরোপুরি বাতিল করে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর জন্য নিজ দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে রয়েছেন। ইসরায়েলি জনমত এবং বিরোধী দলগুলোর বড় একটি অংশ বর্তমান পরিস্থিতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনী দাবি করছে যে, হিজবুল্লাহর ড্রোন ও মিসাইল হামলায় তাদের সেনারা প্রতিদিন নিয়মিতভাবে আহত হচ্ছে, ফলে তারা সংঘাতের মাত্রা বাড়িয়ে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছে।
এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে লেবাননে এ পর্যন্ত ১০ লাখেরও বেশি মানুষ নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন। ইসরায়েল বারবার দাবি করছে যে তারা কেবল হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, তবে লেবানন সরকারের অভিযোগ অনুযায়ী নিহতদের একটি বড় অংশই সাধারণ নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিক। বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননের পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে এবং মানবিক বিপর্যয় চরমে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মহলের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও মাঠপর্যায়ে সংঘাত বন্ধের কোনো কার্যকর লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান হয়নি।
জেএ/অভি