আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইউক্রেন বর্তমানে একটি উদীয়মান আকাশ-শক্তি হিসেবে নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন শুরু করেছে, যা রাশিয়ার জন্য গভীর অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কিয়েভ তাদের উন্নত ড্রোন ও দূরপাল্লার প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাশিয়ার তেল সংরক্ষণাগার, বন্দর ও শোধনাগারগুলোতে সুপরিকল্পিতভাবে আঘাত হানছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো এখন সীমান্ত থেকে প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত রাশিয়ার উরাল অঞ্চলের পার্ম শহরেও হামলা চালাতে সক্ষম হচ্ছে। ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা (এসবিইউ) জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার তেল পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম কৌশলগত কেন্দ্র ট্রান্সনেফটের পাম্পিং ও সরবরাহ কেন্দ্রে সফলভাবে আঘাত হেনেছে, যার ফলে বড় ধরনের অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের এই নিপুণ অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো রাশিয়ার প্রধান অর্থ আয়ের উৎস তেল রপ্তানি সক্ষমতাকে পঙ্গু করে দেওয়া। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীলতায় তেলের বিশ্ববাজার যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন রাশিয়ার বাড়তি আয় কমানোই কিয়েভের মূল কৌশল। ইউক্রেনের দাবি অনুযায়ী, এসব হামলার জেরে রাশিয়ার প্রধান তেল বন্দরগুলোর কার্যকারিতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বাল্টিক সাগরের প্রিমোরস্ক ও উস্ত-লুগা বন্দরের সক্ষমতা যথাক্রমে ১৩ ও ৪৩ শতাংশ কমেছে এবং কৃষ্ণসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নভোরোসিস্ক বন্দরে এই সক্ষমতা প্রায় ৩৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে বলে জানা গেছে।
এই পরিস্থিতির মুখে ক্রেমলিন অত্যন্ত বিরক্ত ও বিব্রত বোধ করছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন অঞ্চলে ৯৮টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করলেও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি ক্রমান্বয়ে স্পষ্ট হচ্ছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এই হামলাগুলোকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করে নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জরুরি সেবা মন্ত্রী আলেক্সান্ডার কুরেনকভকে সরাসরি তদারকির দায়িত্ব দিয়েছেন। এমনকি ড্রোন হামলার আশঙ্কায় আসন্ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘বিজয় দিবস’ প্যারেডের বেশ কিছু সামরিক কর্মসূচিও বাতিল করেছে রুশ কর্তৃপক্ষ।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার’ জানিয়েছে, কেবল এপ্রিল মাসেই রাশিয়ার অন্তত ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। ইউক্রেনের উপপ্রধানমন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ জানিয়েছেন, তারা তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ ব্যয় করছে নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবনে। ইউক্রেনীয় একটি ড্রোন কোম্পানি দাবি করেছে যে তারা এখন ২,০০০ কিলোমিটার দূরত্বেও নির্ভুলভাবে আক্রমণ চালাতে সক্ষম। এর পাশাপাশি ইউক্রেন এখন সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তাদের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি রপ্তানির বিষয়ে আলোচনা করছে, যা মস্কোকে নতুন করে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
যুদ্ধের ময়দানে ইউক্রেন এখন কেবল রক্ষণাত্মক অবস্থানে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা তাদের আক্রমণাত্মক সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। দূরপাল্লার ড্রোন প্রযুক্তিতে ইউক্রেনের এই অভাবনীয় অগ্রগতি রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার তেল ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয়ক্ষতি যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিয়েভের এই ক্রমবর্ধমান শক্তিমত্তা এবং আন্তর্জাতিক নতুন কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন রাশিয়ার সামগ্রিক রণকৌশলকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
জেএ/অভি