Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 07:31 pm

ত্যাগের আকাশে উসমান (রা.) এর সেই ইতিকথা

image

ইতিহাসের পাতায় কিছু নাম চির অম্লান হয়ে থাকে। তাদের জীবনালেখ্য শুধু অতীতের কাহিনি নয়, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য দিশারি। তেমনি এক মহান পুরুষের নাম উসমান ইবনে আফফান (রা.) যিনি লজ্জা, মর্যাদা ও উদারতার এক অনন্য প্রতিমা। যাকে কুরাইশের ধনকুবের বলে সবাই চিনলেও, যার হাতের দান মুসলিম উম্মাহকে স্বর্ণযুগ উপহার দিয়েছিল। যে ব্যক্তি যুন-নুরাইন তথা দুই জ্যোতির অধিকারী উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুই কন্যাকে পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ করার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।

একটি অন্ধকারময় সমাজে যেখানে বংশগরিমা ও অর্থের দাপটে মানুষ পথ হারিয়েছিল, সেখানে উসমান (রা.) ছিলেন এক উজ্জ্বল প্রদীপ। জাহিলিয়াতের কোনো অপকর্ম তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। ব্যবসায় অসাধারণ সততা, সমাজে প্রজ্ঞা ও লৌকিকতার জন্য তিনি ছিলেন সবার প্রিয়। আর যখন ইসলামের ডাক এলো, তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে সাড়া দিলেন যদিও তখন জানতেন, এর পথ কণ্টকাকীর্ণ।

আজকের ব্যস্ত জীবনে, যেখানে মানুষ অর্থ ও ক্ষমতার পেছনে ছুটছে, উসমান (রা.)-এর জীবন আমাদের শেখায় সত্যিকারের সম্মান সম্পদে নয়, চরিত্রে। দানশীলতার প্রকৃত রূপ তিনি বুঝিয়েছিলেন, যেখানে নিজের প্রয়োজনের আগে অপরের কষ্ট লাঘব করাই ছিল তাঁর নীতি। আর আজ আমরা সেই মহামানবের জীবনের নানাদিক নিয়ে জানবো, যাতে তাঁর গল্প শুধু ইতিহাসের পাঠ না হয়, বরং প্রতিটি মানুষের জীবনে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। আসুন, জানি সেই সোনালি অধ্যায়ের গল্প...

উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর বংশ ছিল কুরাইশের সম্ভ্রান্ত উমাইয়া শাখায়। পিতা আফফান, মাতা আরওয়া বিনতে কুরাইজ। সপ্তম পুরুষে গিয়ে তাঁর বংশ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বংশের সাথে মিলিত হয়েছে, উভয়ের পূর্বপুরুষ আবদে মান্নাফ। আরবের ইতিহাস ও কুলবিদ্যায় তিনি ছিলেন অদ্বিতীয় পণ্ডিত। তার প্রজ্ঞা, সৌজন্য ও অভিজ্ঞতার কারণে জাহিলি যুগেও তিনি ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয়।

আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর আহ্বানে তিরিশোর্ধ্ব বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন উসমান (রা.)। বর্ণিত আছে, সিরিয়া সফর থেকে ফিরে তিনি এক আহ্বানকারীর কণ্ঠে শুনেছিলেন, আহমাদ নামের রাসুল মক্কায় আগমন করেছেন। আবু বকর (রা.)-এর কাছেই তিনি সত্য জানতে পারেন। তার ইসলামগ্রহণের পর নিজ চাচা হাকাম ইবনে আবিল আস তাকে রশি দিয়ে বেঁধে নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিল। কিন্তু তার ঈমান ছিল পাহাড়ের মতো অটল। তিনি বলতেন, তোমরা যা ইচ্ছা করো, এই দিন আমি ছাড়ব না।

হিজরতের পর রাসুল (সা.) নিজ কন্যা রুকাইয়্যাকে উসমানের সাথে বিবাহ দেন। হিজরী দ্বিতীয় সনে রুকাইয়ার মৃত্যুর পর তিনি তার দ্বিতীয় কন্যা উম্মু কুলসুমকে উসমানের সাথে দেন। এই অভূতপূর্ব সম্মানের কারণেই তিনি যুন-নুরাইন দুই জ্যোতির অধিকারী উপাধি লাভ করেন। আবু লাহাবের পুত্ররা রাসুলের কন্যাদের তালাক দিলে আল্লাহ যেন উসমানকে তাদের চেয়ে উত্তম প্রতিদান দিলেন।

হযরত উসমান (রা.) ছিলেন সেই চারজনের একজন যাদের ইসলামগ্রহণের কথা তিনি নিজেই বলেছেন, আমি চতুর্থ ব্যক্তি হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করি। খুলাফায়ে রাশেদিনের তৃতীয় খলিফা হিসেবে তার খিলাফতকালে কুরআন এক খণ্ডে সংকলিত হয়, সমুদ্র অভিযান সম্প্রসারিত হয়। কিন্তু ন্যায় ও দানে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। তার জীবন আমাদের শেখায় কীভাবে বিত্তবান হয়েও বিনয়ী থাকা যায় এবং কীভাবে সত্যের পথে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব। তাঁর জীবন প্রতিটি মুমিনের জন্য এক আলোকবর্তিকা।

জা. অর্থনীতি/ উমর