খেলাপি ঋণ যখন সংস্কৃতি হয়ে ওঠে

।। ড. শাহ মো. আহসান হাবীব ।।

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি শব্দটি শুনলেই অস্বস্তি তৈরি হয়, কারণ এখানে ব্যর্থতা নয়, রয়েছে সচেতন অনিচ্ছার বাস্তবতা। এখানে সামর্থ্যের অভাব নেই, অভাব রয়েছে দায়বদ্ধতার। টাকা আছে, সম্পদ আছে, ব্যবসা চলছে, জীবনযাপনেও ঘাটতি নেই, তবু ব্যাংকের ঋণ ফেরত আসে না। ফাইল ঘোরে, ব্যাংক ঘোরে, আদালত ঘোরে, শেষ পর্যন্ত দেশও যেন ঘুরে একই জায়গায় ফিরে আসে। এই স্থবিরতার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে বড় ক্ষতি। কারণ এই খেলাপি শুধু একটি ঋণ নয়। এটি একটি ব্যবস্থা। এটি একটি সংস্কৃতি। এটি দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া একটি ভুল বার্তার ফল, যেখানে নিয়ম ভাঙার খরচ কম আর সুবিধা তুলনামূলক বেশি।  এই সমস্যা মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর যে দুটি শক্তি, তা হলো আইনগত চাপ এবং সামাজিক চাপ। এই দুই চাপ একসঙ্গে কাজ না করলে খেলাপি হওয়া কখনই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে না। বরং বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি হওয়াকে অনেক সময় সুবিধাজনক অভ্যাস হিসেবেই দেখা হয়েছে। আইন যদি কঠোর না হয়, প্রয়োগ যদি ধীর হয়, আর সমাজ যদি খেলাপিকে প্রভাবশালী বা সফল ব্যবসায়ী হিসেবে দেখে, তাহলে খেলাপি হওয়া ব্যয়বহুল নয়, বরং লাভজনক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। এখানেই বাংলাদেশের মূল ঘাটতি এবং এখান থেকেই সংকটটি ধীরে ধীরে গভীর হয়েছে।

আইনগত চাপ বলতে শুধু আইন থাকা বোঝায় না। বোঝায় নিয়ম-কানুন, শাস্তি, নিষেধাজ্ঞা, মামলা, সম্পদ জব্দ, জবাবদিহি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সময়মতো বাস্তবায়ন। আইন কাগজে থাকলেই হয় না। প্রয়োগ থাকতে হয়। দ্রুততা থাকতে হয়। আর সবচেয়ে জরুরি, সবার জন্য সমান হতে হয়। বড় ঋণখেলাপির জন্য এক নিয়ম আর ছোট ঋণগ্রহীতার জন্য আরেক নিয়ম হলে আইন তার নৈতিক শক্তি হারায়। তখন আইন ভয় তৈরি করে না। বরং দর কষাকষির জায়গায় পরিণত হয়। ফলে খেলাপিরা সময়কে নিজের পক্ষে ব্যবহার করার সুযোগ পায়।

এর পাশাপাশি সামাজিক চাপের বিষয়টি আরও গভীর এবং দীর্ঘমেয়াদি। সামাজিক চাপ মানে সমাজে গ্রহণযোগ্যতা হারানো। মান-সম্মানে প্রশ্ন ওঠা। ব্যবসায়িক বিশ্বাস নষ্ট হওয়া। ক্লাব, সংগঠন, পেশাজীবী প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক মর্যাদা, পুরস্কার, এমনকি ‘সম্মানিত ব্যবসায়ী’ পরিচয় নিয়েই সন্দেহ তৈরি হওয়া। সামাজিক চাপ তখনই কার্যকর হয়, যখন সমাজ ঋণখেলাপিকে চালাক বা কৌশলী না ভেবে ক্ষতিকর হিসেবে দেখে। কিন্তু যদি সমাজ তাকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে সম্মান দেয়, তার পাশে দাঁড়ায়, তাকে পুরস্কৃত করে, তাহলে আইন প্রয়োগকারীরাও অনেক সময় মানসিকভাবে পিছিয়ে যায়। বাস্তবতা হলো, আমাদের সামাজিক কাঠামোয় প্রভাব অনেক সময় নিয়মের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

আইনের চাপ ছাড়া সামাজিক চাপ টেকে না, আবার সামাজিক চাপ ছাড়া আইনও দুর্বল হয়ে পড়ে। সমাজ যদি খেলাপিকে প্রশ্রয় দেয়, তাহলে আইন প্রয়োগে অনীহা তৈরি হয়। ফলে ব্যাংকের ঋণ উদ্ধার একটি দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর প্রক্রিয়ায় আটকে যায়। সাধারণত এই উদ্ধার প্রক্রিয়া তিন ধাপে থেমে যায়। প্রথমে শনাক্তকরণে, এরপর চাপ প্রয়োগে, এবং শেষে বাস্তব আদায়ে। আইনগত চাপ দুর্বল হলে শনাক্তকরণই দুর্বল হয়। কে ইচ্ছাকৃত, কে সত্যিকারের সংকটে, কে টাকা সরিয়েছে, কে সম্পদ লুকিয়েছে, কে প্রতিষ্ঠানের আড়ালে ব্যক্তিগত ভোগ বাড়িয়েছে, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায় না।

চাপ প্রয়োগের ধাপে এসে সমস্যা আরও প্রকট হয়। নিষেধাজ্ঞা, পরিচালক হওয়া বন্ধ, নতুন ঋণ বন্ধ, ট্রেড লাইসেন্স বা বিদেশ যাত্রায় বাধা, সম্পদ হস্তান্তরে নিয়ন্ত্রণ-এসব ব্যবস্থা যদি নিয়মিত ও দৃশ্যমানভাবে কার্যকর না হয়, তাহলে খেলাপির কোনো ভয় থাকে না। সাম্প্রতিক সময়ে ইচ্ছাকৃত খেলাপি শনাক্তে কঠোর নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে এই চাপ প্রয়োগের উদাহরণ খুব সীমিত। শেষ ধাপ, অর্থাৎ বাস্তব আদায়, সবচেয়ে কঠিন। মামলা-মোকদ্দমা, পুনঃতফসিল, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব এবং ব্যাংকের নিজস্ব দুর্বলতা মিলিয়ে এখানে ঋণ উদ্ধার অনেক সময় কেবল ফাইলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

এই পুরো ব্যবস্থার ভেতরে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো নৈতিক ঝুঁকি। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় মোরাল হ্যাজার্ড। সহজ কথায়, শাস্তি হবে না জেনে ঝুঁকি নেওয়া। যখন বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে খেলাপি হলেও বারবার ছাড় পাওয়া যায়, পুনঃতফসিল সহজ হয়, এক্সিট সুবিধায় কাগজে-কলমে আবার ‘ভালো গ্রাহক’ হয়ে ওঠা যায়, তখন বার্তাটি খুব পরিষ্কার হয়ে যায়। খেলাপি হওয়া লাভজনক। নিয়ম মানা বোকামি। এই ঝুঁকি শুধু খেলাপিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যাংকের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ে। ঋণ অনুমোদনে দায়িত্বহীনতা বাড়ে, কারণ ক্ষতি হলে শেষ পর্যন্ত দায় পড়ে আমানতকারীর ওপর, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক হলে করদাতার ওপর। ফলে দায় ব্যক্তিগত, সুবিধা সামষ্টিক-এই বিকৃত প্রণোদনাই দীর্ঘদিন ধরে জমে উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা জরুরি। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি সাধারণত কোনো ব্যবসায়িক ব্যর্থতা নয়। এটি স্পষ্টভাবে একটি আর্থিক অপরাধ। এখানে বাজার ঝুঁকি বা ভুল সিদ্ধান্তের গল্প নেই। আছে পরিকল্পিত অর্থ আত্মসাৎ। ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ঋণ না দেওয়া, সম্পদ লুকানো, প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে ব্যক্তিগত ভোগে ব্যয় করা-এসবই অপরাধমূলক আচরণ। তাই একে নীতিগত দুর্বলতা বা ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা হিসেবে দেখলে বাস্তবতা আড়াল হয়। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিকে অপরাধ হিসেবেই দেখতে হবে। তদন্ত হতে হবে ফৌজদারি দৃষ্টিকোণ থেকে। মামলা ও শাস্তিও হতে হবে সেই অনুযায়ী। নইলে বার্তা যাবে, বড় অঙ্কের আর্থিক অপরাধ আলোচনার টেবিলে বসে ‘সমাধানযোগ্য’।

আরও বড় সত্য হলো, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি মানে কেবল ব্যাংকের ক্ষতি নয়। এটি সরাসরি জনসাধারণের অর্থের অপব্যবহার। ব্যাংকের টাকা আসে আমানতকারীর কাছ থেকে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ক্ষেত্রে আসে করদাতার পকেট থেকে। একটি খেলাপি ঋণ মানে হাজারও মানুষের সঞ্চয়ের ওপর আঘাত। উন্নয়ন ব্যয়ের সুযোগ নষ্ট হওয়া। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোর মতো খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া। তাই এটিকে কোনো ব্যবসায়ী ও ব্যাংকের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা ভুল। এটি জনস্বার্থের প্রশ্ন। জনগণের অর্থ আত্মসাতের প্রশ্ন। সেই কারণেই রাষ্ট্রের অবস্থান এখানে স্পষ্ট হওয়া দরকার। সহানুভূতি নয় দায়বদ্ধতা। সমঝোতা নয় বিচার।

এই সংকটকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে সাম্প্রতিক সময়ে ঋণখেলাপির ক্রমবর্ধমান প্রবণতা। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও অনুপাত এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা আন্তর্জাতিক তুলনায়ও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার অনেক ক্ষেত্রে বৈশ্বিক গড়ের চেয়েও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশই প্রকৃত অর্থে ইচ্ছাকৃত। অর্থাৎ এখানে অর্থনৈতিক মন্দা বা ব্যবসায়িক অচলাবস্থার চেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে পরিকল্পিত অনাদায়।

এই প্রবণতা শুধু সংখ্যা দিয়ে বোঝা যায় না। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো অর্থনীতিতে। ব্যাংকের তারল্য চাপ বাড়ে। নতুন ঋণ দেওয়া কমে যায়। উৎপাদনশীল খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিনিয়োগে আস্থা কমে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও সতর্ক হয়ে ওঠে। যখন একটি দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দীর্ঘদিন ধরে বাড়তে থাকে, তখন সেটি আর শুধু ব্যাংকিং সমস্যা থাকে না। এটি সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকিতে পরিণত হয়। সেই অর্থে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং সতর্কবার্তা।

সরকারের দায়িত্ব এখানে সীমিত নয়। আইন শক্তিশালী করা, আদালতের গতি বাড়ানো, রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো, বড় ঋণ কেলেঙ্কারিতে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা-এসবই সরকারের মৌলিক দায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব আরও সরাসরি। নিয়ম করা, তদারকি করা এবং প্রয়োগ নিশ্চিত করা। শুধু সার্কুলার জারি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ব্যাংক নিয়ম মানছে কিনা, না মানলে কী শাস্তি হচ্ছে, সেটিও দেখতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা ছাড়া এই প্রয়োগ টেকসই হয় না। দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল তদারকি এবং আইনি জটিলতা ব্যাংক খাতকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

বাংলাদেশের দুর্বলতা এখানেই স্পষ্ট। একদিকে শনাক্তকরণে দ্বিধা। অন্যদিকে প্রয়োগে অনীহা। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ছাড়ের সংস্কৃতি। পুনঃতফসিল, বিশেষ সুবিধা, দীর্ঘ গ্রেস পিরিয়ড, কম ডাউন পেমেন্ট—এসব স্বল্পমেয়াদে চাপ কমালেও দীর্ঘমেয়াদে নৈতিক ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়ম ভাঙার খরচ যখন কমে যায়, তখন নিয়ম মানার প্রণোদনাও হারিয়ে যায়। এর ফল চোখের সামনেই- খেলাপি ঋণ বাড়ছে, আস্থা কমছে এবং ব্যাংক খাত দুর্বল হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সংস্কারের কথা অনেক বলা হচ্ছে। নির্দেশনা, ফ্রেমওয়ার্ক, অডিট, নীতিমালার পরিবর্তন-সবই আছে। কিন্তু সমস্যা হলো দ্বৈত সংকেত। একদিকে কড়াকড়ির কথা। অন্যদিকে ছাড়ের বাস্তবতা। এই দ্বন্দ্ব কাটানো না গেলে ফল দৃশ্যমান হবে না। কারণ ফল আসে ধারাবাহিক প্রয়োগে, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিরোধ ভাঙার মাধ্যমে। সেটিই সবচেয়ে কঠিন কাজ।

শেষ পর্যন্ত কথা খুব জটিল নয়। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি নিয়ন্ত্রণে কোনো জাদুকরী সমাধান নেই। ঋণ বন্ধ করলেও সমাধান নয়। ছাড় দিলেও সমাধান নয়। সমাধান তখনই আসবে, যখন খেলাপি হওয়া সামাজিকভাবে লজ্জার এবং আইনগতভাবে ব্যয়বহুল হবে। আইনকে ধারাবাহিক হতে হবে। সমাজকে সৎ হতে হবে। আর রাষ্ট্রকে সাহসী হতে হবে। নইলে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি থাকবে, ব্যাংক দুর্বল হবে, আর শেষ পর্যন্ত ব্যয়ভার সেই সাধারণ মানুষ, যার কোনো প্রভাব নেই, কিন্তু যার টাকাই এই ব্যবস্থার ভিত্তি।

লেখক: অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট